সুনামগঞ্জের হাওরে ৪ বছরে বজ্রপাতে মারা গেছেন ৫১ জন

হাওরের জনপদ সুনামগঞ্জে ট্র্যাজেডির আরেক নাম হচ্ছে বজ্রপাত। প্রতি বছর শুধুমাত্র বজ্রপাতেই প্রাণ ঝরছে অসংখ্য মানুষের। বৃষ্টির মৌসুম আসলেই হাওরাঞ্চলে দেখা দেয় বজ্রপাতের শঙ্কা।

২০১৮ থেকে ২০২১ সাল এই চার বছরে সুনামগঞ্জ জেলায় বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে অর্ধশতাধিক ব্যক্তির। এছাড়াও ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে আরও অর্ধশত প্রাণ হারানোর তথ্য রয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম ও বেসরকারি সংস্থার কাছে। যদিও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে বজ্রপাতে মৃত্যুর সঠিক কোনও পরিসংখ্যান নেই।

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার ও জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয় সূত্র থেকে জানা যায়, সুনামগঞ্জে সবচেয়ে বেশি মানুষ বজ্রপাতে মারা যায় ২০১৮ সালে। সেই বছর সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে বজ্রপাতে ২৫ জন মারা যান এবং সেটিই সুনামগঞ্জের এক বছরের সর্বোচ্চ মৃত্যু। ২০১৯ সালে প্রাণ হারান ৯ জন, ২০২০ সালে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১০ জন এবং চলতি বছরের ১৯ মে পর্যন্ত বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে সাতজনের।

২৮ এপ্রিল ধান কাটতে গিয়ে প্রাণ হারান দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়ার ইউনিয়নে মধুরাপুর গ্রামের ফকরুল ও ফজলু মিয়া নামের দুই সহোদর। পরিবারের দুই উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে পরিবারটি। দুই পরিবারের ১২ সদস্য নিয়ে শোক সাগরে ফজলু ও ফখরুলের স্ত্রী। এছাড়াও বজ্রপাতে দোয়ারাবাজারে ২ জন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ১ জন, ছাতক উপজেলায় ১ জন ও বিশ্বম্বরপুর একজনসহ মোট সাতজনের মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালে বজ্রপাতে একই পরিবারের বাবা-ছেলের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে তিনটি। বজ্রপাতের কবলে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে কৃষক, জেলেসহ নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যাই বেশি।

সুনামগঞ্জে মার্চ থেকে মে, এ তিন মাসে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২৫টিরও বেশি বজ্রপাত আঘাত হানে। ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের পূর্বাঞ্চলে বজ্রপাতের পরিমাণ প্রাকৃতিকভাবেই বেশি। ভারতের খাসিয়া পাহাড় ও মেঘালয় এলাকায় মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত মেঘ জমে থাকে। স্তরীভূত মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে ওই এলাকার পাদদেশে অবস্থিত সুনামগঞ্জ জেলায় বজ্রপাতের সংখ্যাও বেশি হয়ে থাকে। আর এ বজ্রপাতে বাংলাদেশের হাওর প্রধান জেলা সুনামগঞ্জে প্রতিবছর প্রাণ হারায় অনেক মানুষ।

কৃষি ও মৎস্য আহরণ এই দুইটি সুনামগঞ্জের আয়ের প্রধান উৎস হলেও সেই হাওরেই প্রতিবছর বজ্রপাতে প্রাণ দিতে হয় অনেককে। সরকার থেকে বজ্রপাতে মারা যাওয়া পরিবারকে ২০ হাজার টাকা ও আহত ব্যক্তিকে ৫ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়। তাছাড়া বজ্রপাতে মারা যাওয়া পরিবারের পুনর্বাসনের জন্যে কোনও উদ্যোগ গ্রহণ হয়নি। পরিবারের আয়ের একমাত্র ব্যক্তিকে হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয় অনেকের।

দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়ার ইউনিয়নে মধুরাপুর গ্রামের ফজলু ও ফখরুল নামে দুই ভাই ছিলেন বর্গা চাষি। ২৮ জুন ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে মৃত্যু হয় তাদের। ফজলু ও ফখরুলের পরিবারে বৃদ্ধা মা, স্ত্রী সন্তানসহ সদস্য ১২ জন। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে শোক সাগরে পরিবারটি। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতের দিকে নাবালক সন্তানদের।

এভাবে বজ্রপাতে পরিবারের কর্তাব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা অনেক পরিবার। বজ্রপাতে নিহত পরিবারের পাশে সরকারের পাশাপাশি মানবিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।

এদিকে হাওরে বজ্রপাত থেকে মানুষদের সচেতন ও প্রাণহানি কমাতে তালগাছ না লাগিয়ে হাওরে ও খোল জায়গায় নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বজ্র নিরোধক যন্ত্র লাগানো ও বজ্রপাতে মারা যাওয়া পরিবারকে মোটা অংকের একটি অনুদান এবং সকল হাওরের কৃষক ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার জন্য সচেতনমূলক প্রচারণা জোরদার করার দাবি জানান হাওর উন্নয়নে সংশ্লিষ্টরা।

হাওর হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, সুনামগঞ্জ সবচেয়ে বজ্রপাত প্রবণ এলাকা। প্রতি বছরই বজ্রপাতে প্রাণ যায় নিম্ন আয়ের মানুষের। সরকারকে সুনামগঞ্জ জেলার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে হাওর ও খোলা জায়গায় অতিদ্রুত বজ্র নিরোধক যন্ত্র স্থাপনের আহ্বান জানান তিনি। এছাড়া মারা যাওয়া পরিবারের পুনর্বাসনে আর্থিক অনুদানসহ হাওর এলাকার মানুষদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করার তাগাদা জানান বিজন সেন।

জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সুনামগঞ্জে প্রতি বছর হাওরে কাজ করতে গিয়ে বজ্রপাতে কৃষক, জেলেসহ নিম্ন আয়ের মানুষ মারা যান। বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে হাওরে গাছ লাগানোর কথা চিন্তা করছি আমরা।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বজ্রপাতে নিহত পরিবারকে এককালীন ২০ হাজার ও আহত ব্যক্তিকে ৫ হাজার টাকা প্রদান করা হচ্ছে বলে জানা তিনি।

বার্তাবাজার/ভিএস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর