ভোর রাতে জমজমাট মানুষ কেনা-বেচার হাট
প্রাচীনকালে ও মধ্যযুগে সমাজে মানুষ কেনা-বেচার হাট বসত। সেই দাস প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে কবেই। কিন্তু একাবিংশ শতাব্দীর তথ্য-প্রযুক্তির যুগেও ক্ষুধা আর দারিদ্রের নির্মম আঘাতে নিম্ন আয়ের মানুষগুলো দু’বেলা রুটিরুজির জন্য আজও নিজেকে বেচে দেন মানুষের হাটে। এমন চিত্রই দেখা যায় বগুড়ার শেরপুরের খানপুর ইউনিয়নের শালফা গ্রামে।
রোজার দিনে সেহরী খেয়ে কাস্তে ও বাং হাতে মানুষগুলো ভিড় জমাচ্ছেন মানুষ কেনা-বেচার হাটে! চুক্তি ভিত্তিক ১ দিনের জন্য অন্যের জমিতে কাজ করার জন্য বিক্রি হন তারা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঘাম ঝরিয়ে কাজ করেন কঠোর পরিশ্রমী মানুষগুলো। মজুরী বুঝে পেলে এবার বাড়ি ফেরার পালা। এরপর আরও একটি ভোরের অপেক্ষা, কাজের জন্য ছুটেচলা মানুষের হাটে।
কয়েক যুগেরও বেশি আগে থেকে শালফা গ্রামে মানুষ কেনা বেচার হাট বসে। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিতই মানুষ বেচা কেনা হয়। মানুষ বেচা-কেনার এ হাটে নেই কোন খাজনা, সমিতির ঝামেলা, হাট কমিটির চাঁদাবাজি। নিজের আপন গতিতেই চলে এই হাট। শ্রমজীবী মানুষেরা সেদিক দিয়ে শান্তিতে থাকলেও তাদের কাজের নিশ্চয়তা এবং জীবনের নিরাপত্তা অনিশ্চিত।
ধুনট উপজেলার মাঠপাড়া গ্রাম থেকে আসা কৃষকেরা জানান, এখানে শুধু কৃষি জমি নিরানির জন্য প্রতি মানুষ ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, ধান কাটা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং মাটি কাটা, শরিষা তোলা, ধানের বীজ রোপন ও ধান কাটার জন্য ৩৫০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকায় মানুষ ক্রয় বিক্রয় হয়। ভোরে মানুষে সরগরম হয়ে ওঠে এই বাজার। বেলা উঠার সাথে সাথে বাজার শেষ হয়ে যায়। শ্রমের এই বাজারে শ্রমিক কিনতে আসেন মালিকেরা। অনেক শ্রমজীবী বিক্রি হলেও অনেকেই থেকে যান অবিক্রিত তারা বাড়িতে ফিরে যায় মনে দুঃখ নিয়ে।
সংসার চালানোর জন্য নিজেকে প্রতিদিন বিক্রি করতে আসেন মানুষের হাটে এমন একজন পান্তাপাড় গ্রামের হযরত আলীর ছেলে শাহআলী বলেন, আমি প্রায় ১৫ বছর ধরে এখানে আসি। সেই ১০০ টাকা থেকে শুরু করে আজ ৪০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রয় হচ্ছি। ভাগ্যের পরিহাসে কোন কোন দিন থেকে যাই অবিক্রিত।
কুসুম্বি ইউনিয়নের বাগড়া এলাকার জহুরুল ইসলাম জানান, সকালে না আসলে আমাদের বাড়ীর চুলা জলে না। পরিবার না খেয়ে থাকবে। তারই বাস্তব প্রমান করোনার জন্য যখন আমরা ঘরবন্দি হয়ে ছিলাম তখন কেউ আমাদের সহযোগিতা করেনি। অনেক দিন না খেয়ে দিন কাটিয়েছি। শুনেছি সরকার অনেককিছু দিচ্ছে আমরাতো সেগুলো পাই না। মেম্বর, চেয়ারম্যানকে যারা টাকা দেয় তারা পায়।
মানুষ কিনতে আসা মোজাম্মেল হক বলেন, শ্রমিকের দাম একটু বেশি হলেও এখানে সহজে কাজের লোক পাওয়া যায়। একজন ইট, বালি ও মাটি সরানোর জন্য মানুষ নিয়েছি ৩৫০ টাকায়। মানুষের এই হাটে বেচাকেনা চলে কাকডাকা ভোর থেকে সকাল ৭ টা পর্যন্ত। দাম দর ঠিক হয়ে গেলে শ্রমজীবী মানুষগুলো রওনা হন মালিকের গন্তব্যে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ময়নুল ইসলাম বলেন, যদি সরকারি কোন বরাদ্দ আসে তাহলে তাদের সহযোগিতা করা হবে। তবে আমি যতটুকু পারি সহযোগিতা করব।
রাশেদুল হক/বার্তাবাজার/পি