মজিবুন্নেসারা ভালো নেই!

মজিবুন্নেসা (৬৫), সাভারের আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় থাকেন। ৩০ বছরের একমাত্র প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে স্বামীহারা এই ‘সিনিয়র সিটিজেন’ একপ্রকার মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নিজেও খুব অসুস্থ।

রবিবার (৯ মে) দুপুরে আশুলিয়ার কাঠগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর সাথে কথা হয়। এখানে এসেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঈদ উপহার হিসেবে নগদ ৪৫০ টাকা দেওয়া হবে সেটা নিতে। আগে যা ও মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চেয়ে-চিন্তে (ভিক্ষা) জীবন নির্বাহ করতেন, কিন্তু করোনার কারণে সেটাও বন্ধ। এখন কারও বাড়ি ঢুকতে দেয়না। নিজের কষ্ট ও ক্ষোভ প্রকাশ করে এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী উপহার দেবে শুনছি, আল্লায় যদি দেওয়ায় তাইলে এই ঈদে একটু খাইতে পারমু।’

ছল্লুমা বেগম (৬৮)। তাঁর সন্তান নাই। স্বামী আছেন, তবে পঙ্গু। তিনি বললেন, ‘আমার স্বামী আছে, তার একখান ঠ্যাং (পা) অবশ। গ্রামে গ্রামে ঘুরি ফিরি আর সাহায্য চাইয়া খাই। অহন তো করোনায় কামও নাই। মাইনষের বাড়ি গেলে দূর দূর করি তাড়ায় দেয়। আমরা অনেক গরীব, মাইনষে জানে।’

সাহেরা (৬২) এবং ভানু (৬৫) দু’জনে জানালেন, তারা কোনো ধরণের ভাতা পান না। এরা আশুলিয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলীর ওয়ার্ডে বসবাস করেন। আজ এসেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঈদ উপহার দেবেন সেটা নিতে।

কাঠগড়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ছিলো এরকম বয়স্ক, অসহায় ও কর্মহীন সিনিয়র সিটিজেনদের ভিড়। এদের কয়জনের সাথে কথা বলবে এই প্রতিবেদক? করোনা ও চলমান লকডাউনের কারণে এদের সবারই একই অবস্থা। এদের সবার গল্পই একই। সেখানে বিরাজমান নিরন্তর এক ক্ষুধার রাজ্য। পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরকে সামনে রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার ৪৫০ টাকাকে ঘিরে এদের সকলের সাময়িক স্বপ্ন পূরণে এরা এই ভরদুপুরে অবস্থান করছিলেন এই স্কুল মাঠে। একদিনের স্বপ্ন পূরণ! একটু ভালোভাবে ক্ষুধা মিটাবে ঈদের দিনে!!

আশুলিয়া ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডে গিয়ে কথা হয় রওশন আরা নামের আরেক সিনিয়র সিটিজেনের সাথে। নিজের বয়স কত হয়েছে সেটা বলতে পারেন না তিনি। এখানে এসেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য হোসেন আলী মেম্বারের অফিসের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার গ্রহন করতে।

এভাবে রবিবার (৯ মে) দিনভর আশুলিয়া ইউনিয়নের ১,২,৩ ও ৪ নং ওয়ার্ডে অসহায় ও দুঃস্থ মানুষদের মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত ঈদ উপহার ৪৫০ টাকা গ্রহন করতে আগত মানুষের ভিড় পরিলক্ষিত হয়েছে। এই ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান শাহাব উদ্দিন মাদবর সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যদের সাথে নিয়ে তালিকা অনুযায়ী এদব কর্মহীন মানুষের মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ করেছেন। কথা হয় তাঁর সাথেও।

এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, করোনাকালীন সময়ে কর্মহীন, অসহায় ও দুঃস্থ মানুষের জন্য ঈদ উপহার হিসেবে পরিবার প্রতি ৪৫০ টাকা এবং যাদের ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কার্ড রয়েছে, তাদেরকে যে দশ কেজি করে চাল দেবার কথা, তার পরিবর্তে তাদের জন্য ৫০০ টাকা করে নগদ বিতরণ করা হয়েছে।

চেয়ারম্যান শাহাব উদ্দিন মাদবর আরও জানান, আজ (রবিবার) এই চার ওয়ার্ডে আনুমানিক ১৩০০ জনকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার বিতরণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১০৩৪ জনকে ৪৫০ টাকা করে এবং বাকি ২৬৬ জনকে ৫০০ টাকা করে বিতরণ করা হয়েছে। ইউনিয়নের বাকি ওয়ার্ডগুলোতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

মজিবুন্নেসাদের সবার গল্প একই। তারা কেউ ভালো নেই। স্বাভাবিক সময়ে যতটুকু ভালো তারা ছিলেন, এই করোনার আপদকালীন সময়ে এক ভয়াবহ অবস্থার ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন তারা। এদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, কত বয়স হলে তারা বয়স্ক ভাতা পাবেন! অশিক্ষিত এসব সিনিয়র সিটিজেনরা জানেন না নিয়ম কি? কেউ কেউ এই এলাকায় দীর্ঘদিন বসবাস করে আসছেন। হয়েছেন এখানের ভোটার। কিন্তু রাষ্ট্রের থেকে প্রাপ্ত ন্যুণতম সুবিধা গ্রহনে এদের কেউ কেউ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও তাদের অধীনস্থদের স্বজনপ্রীতির কারণে সুবিধা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই এলাকার বাসিন্দা নন, কিন্তু ভোটার এখানের। আবার অনেকে নিজ এলাকার ভোটার, থাকেন এখানে। এরা পাচ্ছেন না এখানে কোনো সুবিধা। যেতেও পারছেন না নিজ এলাকায়। এখানের ভোটাররা নিজ এলাকায় গেলেও পাবেন না তাদের জন্য প্রদত্ত সুবিধা। অনেকে এখানেও পাচ্ছেন না। তাহলে মজিবুন্নেসারা যাবেন কোথায়? এই প্রতিবেদকের মাধ্যমে তারা সেই প্রশ্ন করেছেন জনপ্রতিনিধি ও রাষ্ট্রের কাছে।

মোঃ আল মামুন খান/বার্তাবাজার/ভিএস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর