বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা। বিএনপি চেয়ারপারসন, দুবারের প্রধানমন্ত্রী। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বেগম জিয়া অসুস্থ। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন। বেগম জিয়ার পক্ষে তাঁর ভাই শামীম এস্কান্দার বুধবার (৫ মে) রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বেগম জিয়াকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া-সংক্রান্ত লিখিত আবেদন জমা দেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাতেই ওই আবেদনটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আবেদনটি নিয়ে যে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। একই প্রশংসার দাবিদার আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক। তিনি বলেছেন, ‘বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছেন। আমরা প্রত্যাশা করি, দেশে অথবা বিদেশে যেখানেই হোক বেগম জিয়া সুস্থ হয়ে উঠুন।
কিন্তু তাঁর অসুস্থতার ধরন প্রকরণ নিয়ে একটি ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি রাজনৈতিক অসুস্থতার এক ভিন্ন রূপ বলেই আমার বিশ্বাস। হাসপাতালের তথ্যমতে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বেগম জিয়া করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) আছেন। সাধারণত গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সিসিইউতে নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়। বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা কতটা জটিল, তার অসুস্থতার ধরন কী এসব নিয়ে যেন লুকোচুরি খেলা চলছে। একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ অসুস্থ হতেই পারেন।
দেশের জনগণের জানার অধিকার আছে তাঁর অসুস্থতার মাত্রা কী? আমি মনে করি বেগম জিয়ার অসুস্থতা এবং চিকিৎসার বিষয়টি সম্পূর্ণ মানবিক। রাজনীতির ঊর্ধ্বে। এ নিয়ে ছলচাতুরী কিংবা রাজনীতি করা কারও-ই উচিত নয়। আমি খুশি হয়েছি, যখন দেখেছি বেগম জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী দুজন নেতা সমবেদনা জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বেগম জিয়ার রোগমুক্তি কামনা করেছেন।
আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্মসাধারণ সম্পাদক তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘আশা করি বেগম জিয়া করোনাকে পরাজিত করবেন।’ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বুধবার রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে টকশোয় শুরুতেই বেগম জিয়ার সুস্থতা কামনা করলেন।
আওয়ামী লীগের কেউ বেগম জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করেননি বরং সহানুভূতি দেখিয়েছেন। এটাই রাজনৈতিক শিষ্টাচার। রাজনৈতিক নীতি ও আদর্শের বিরোধ থাকবে। কিন্তু অসুস্থ একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সুস্থতা কামনা এবং তাঁকে সহযোগিতা করাই সভ্য রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তাঁর প্রবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য যে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা দেখিয়েছেন তা অনন্য এবং অনুকরণীয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, বেগম জিয়া ২০১৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি একটি দুর্নীতি মামলায় দন্ডিত হন। পরে আরও এক মামলায় দন্ডিত হয়ে তিনি মোট ১৭ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত। বেগম জিয়াকে কারামুক্ত করতে তাঁর দল বিএনপি বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন করেছে। কিন্তু সে আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি।
একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতার জন্য এমন নিরুত্তাপ এবং লোক দেখানো আন্দোলন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে নজিরবিহীন। বেগম জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু এ আইনি লড়াইয়েও বিএনপিকে দেখা গেছে সমন্বয়হীন এবং গা-ছাড়া। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বেগম জিয়ার জামিন আবেদন নাকচ করে দেয়।
বেগম জিয়ার মুক্তির সব দরজা যখন বন্ধ ঠিক তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদারতার এক অসামান্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করে বেগম জিয়াকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন গত বছরের ২৫ মার্চ। ছয় মাস করে এ জামিনের মেয়াদ তৃতীয়বারের মতো বাড়ানো হয়েছে। একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার দগদগে স্মৃতি বুকে নিয়ে শেখ হাসিনার এ সিদ্ধান্ত রাজনীতিতে উদারতা ও সহানুভূতির এক উদাহরণ। সুস্থধারার রাজনীতিচর্চার এক বিজ্ঞাপন। গত বছরের ২৫ মার্চের পর থেকে বেগম জিয়া তাঁর বাসভবনেই রয়েছেন। রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন।
এ রকম একজন রাজনীতিবিদকে নিয়ে বিএনপি এবং বিএনপিপন্থি চিকিৎসকরা অযথা মিথ্যাচারের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। বেগম জিয়ার যেদিন করোনা পরীক্ষা করা হলো সেদিনই এ লুকোচুরি এবং সত্য গোপনের খেলা শুরু। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলো, বেগম জিয়ার বাসায় গিয়ে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক বললেন, ‘করোনা পরীক্ষা হয়নি। বেগম জিয়ার রুটিন পরীক্ষা করা হয়েছে।’ সবাই ভিরমি খেল।
পরদিন আইডিসিআরের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত হলো, বেগম জিয়া কভিড পজিটিভ। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে জানতে চাওয়া হলো। তিনি বললেন, এ রকম কোনো তথ্য নেই তাঁর কাছে। অবশেষে ব্যক্তিগত চিকিৎসক কবুল করলেন বেগম জিয়া করোনায় আক্রান্ত। করোনা নিয়ে এখন বাংলাদেশে সবাই টুকটাক জানেন। বেগম জিয়া ৭৬ বছর বয়সী। তাঁর উচ্চ রক্তচাপ আছে। আছে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। এ ধরনের মানুষ করোনায় আক্রান্ত হলে উচ্চঝুঁকিতে থাকেন। অথচ বিএনপিপন্থি চিকিৎসকরা বীরদর্পে বললেন, ‘ম্যাডামের কোনো উপসর্গ নেই। তিনি একদম সুস্থ।’ যেন করোনার বিরুদ্ধে বেগম জিয়াকে আপসহীন প্রমাণ করতেই হবে।
তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন বাসায় থেকেই চিকিৎসা চলবে। কদিন পর কমান্ডো কায়দায় বেগম জিয়াকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলো। মধ্যরাতের একটু আগে আবার চিকিৎসকদের মধ্যে বিজয়ের উল্লাস। তাঁরা বললেন, ‘সিটিস্ক্যান রিপোর্ট খুব ভালো’।
পরদিন গণমাধ্যম এভারকেয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানল, বেগম জিয়ার ফুসফুসে সামান্য সংক্রমণ আছে। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর আবার চিকিৎসকরা হইহই করে উঠলেন। বললেন, ‘এসব কিছু না, সামান্য সংক্রমণ। বেগম জিয়া ভালো আছেন।’ বেগম জিয়াকে সুস্থ দেখানোর কী প্রাণান্ত চেষ্টা!
কদিন পর ‘সুস্থ’, ‘স্বাভাবিক’ বেগম খালেদা জিয়াকে আবার হাসপাতালে নেওয়া হলো। চিকিৎসকরা আবার বললেন, ‘বেগম জিয়া ভালো আছেন। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। গভীর রাতে বলা হলো, তাঁকে হাসপাতালে রেখেই আরও পরীক্ষা করা হবে। নাটকের শেষ এখানেই নয়। হঠাৎ এক বিকালে জানানো হলো, শ্বাসকষ্টের কারণে বেগম জিয়াকে সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। রাতে বেগম জিয়ার একজন চিকিৎসক এসে বললেন, ‘তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল।’ গণমাধ্যমের মুহুর্মুহু প্রশ্ন এড়িয়ে তিনি বললেন, ‘এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।’ কী অদ্ভুত।
দেশের একজন অন্যতম প্রধান নেতা অসুস্থ, তাঁর শারীরিক অবস্থার সঠিক তথ্য জানাতে এত আড়ষ্টতা কেন? বেগম জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে এ ধরনের লুকোচুরি করার ইতিহাস এটাই প্রথম নয়। ২০১৮ সালে এর সূচনা। সে সময় বিএনপি নেতারা প্রতিদিন বেগম জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে আর্তনাদ করতেন। বিশেষ করে বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভীর কথা শুনে মনে হতো কালই বোধহয় বিএনপি চেয়ারপারসন সম্পর্কে ভয়ংকর কোনো খারাপ সংবাদ পাওয়া যাবে। এরপর শুরু হলো বিএনপি নেতাদের কথার প্রতিযোগিতা। প্রত্যেক বিএনপি নেতাই যেন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। কেউ বলেন, বেগম জিয়া হাঁটতে পারছেন না। কেউ বলেন খেতে পারছেন না। একদিন তো বিএনপি মহাসচিব ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে বললেন, ‘ম্যাডাম হাত নাড়াতে পারছেন না।’ জেল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসক পাঠালেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলো। দেখা গেল তেমন গুরুতর কিছু নয়। এরপর বেগম জিয়াকে নেওয়া হলো বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেই ওই একই অবস্থা। চিকিৎসকরা বলেন, বেগম জিয়ার অসুস্থতা গুরুতর নয়। বিএনপি নেতারা বলেন, বেগম জিয়া মৃত্যুর মুখে। তখন বেগম জিয়াকে অসুস্থ বানানোর প্রাণান্ত চেষ্টা আর এখন তাঁকে সুস্থ বলার অদ্ভুত কসরত। কেন? (সংক্ষেপিত)- বাংলাদেশ প্রতিদিন।
লেখক: সৈয়দ বোরহান কবীর; নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
বার্তা বাজার/এসজে