চরফ্যাসনের দুলারহাট থানার নীলকমল ইউনিয়নের চর নুরুল আমিন গ্রামে ধর্ষণের শিকার সেই প্রতিবন্ধী তরুণী ছেলে সন্তানের মা হয়েছেন। সন্তান জন্মের ১ মাস পরেও সন্তানের বাবার পরিচয় নিশ্চিতে কোন উদ্যোগ নেই পুলিশের।
তরুণী অন্তঃস্বত্বা অবস্থায় করা ধর্ষণ মামলাটিরও কোন অগ্রগতি নেই। মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সন্তান জন্মের পর ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে ধর্ষক চিহ্নিত করার কথা বলেছিল। পুলিশের উদাসীনতার কারণে বর্তমানে সে পদক্ষেপও থমকে আছে।
এদিকে প্রতিবন্ধী তরুণীর ধর্ষণ আর পরবর্তীতে সন্তান জন্মের ঘটনাকে নিয়ে ‘ভিলেজ পলিটিক্স’ শুরু করেছে স্থানীয় একাধিক গ্রুপ। প্রথমে মাদরাসা পড়ুয়া ১০ বছরের এক শিশু নাঈমের প্রকৃত বয়স গোপন করে ধর্ষক হিসেবে অভিযুক্ত করা হলেও এখন বেড়িয়ে আসছে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ত্রিমুখী টনাপোড়েনে পড়ে নবজাতককে নিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে চলছে প্রতিবন্ধী মা।
প্রতিবন্ধী তরুণী বাদী হয়ে দায়ের করা মামলার আর্জিতে দাবি করা হয়, মাদরাসা পড়ুয়া ১০ বছর বয়সী আসামী নাঈম বাদিনীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে গত বছরের ২৪ মার্চ ধর্ষণ করে। তারপর থেকে নাঈম ও ভিক্টিম স্বামী-স্ত্রীর মতো মেলামেশা করেন। ভিক্টিম ৩ মাসের অন্তঃস্বত্বা হলে নাঈমের পরিবারকে বিষয়টি অবহিত করেন। নাইম পরিবার তাকে(ভিক্টিম) গ্রহণে অস্বীকার করেন। এপ্রেক্ষিতে তিনি ভিক্টিম ২০২০ সালের ১৪ আগস্ট দুলারহাট থানায় মামলা করেতে যান। থানা পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকার করায় ২০২০ সনের ১৭ আগষ্ট তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুন্যালে মামলা করেন। ওই মামলায় ১০ বছরের শিশু নাইমের বয়স ২৫ বছর দেখানো হয়েছে। এবং ওই মামলায় শিশু নাঈম ও বাবা আবদুল আলী, বড় ভাই নুরুদ্দিন, প্রতিবেশী রফিকসহ চার জনকে আসামী করা হয়েছে। এ ঘটনার ২০২০ সনের ২১ সেপ্টেম্বর সমকালে সংবাদ প্রকাশ হয়।
আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য দুলারহাট পুলিশকে দায়িত্ব দেয়। ভিক্টিম অন্তঃস্বত্বা হওয়ায় সন্তান জন্মের পর ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে ধর্ষক চিহ্নিত করার কথা বলে তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখে। কিন্তু গত ২৭ মার্চ তারিখ তরুণী একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। এর পর এতোদিন পার হয়ে গেলেও পুলিশ আর কোন পদক্ষেপ নেয়নি।
এদিকে স্থানীয় একাধিক গ্রুপ এঘটনাকে পূজি করে নিজেদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ফায়দা লুটার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মামলায় অভিযুক্ত নাইমের বাবা আবদুল আলী ছেলেকে দায়মুক্ত করতে স্থানীয়ভাবে নানা ফন্দি ফিকিরে জড়িয়ে পড়েছেন। বিষয়টিকে জমিজমা নিয়ে বিরোধ দাবি করে প্রতিপক্ষের ঘাড়ে চাপানোর চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার সাথে স্থানীয় একটি রাজনৈতিক গ্রুপ যুক্ত রয়েছে।
আর ঘটনার শুরু থেকে বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মরিয়া স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি তছির আহম্মদ পাটোয়ারী। তরুণীর ধর্ষণের বিষয়টি কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের জমি জমা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রতিবন্ধী তরুণী প্রথমে শিশু নাইমের বিরুদ্ধে মামলা করলেও এখন প্রতিবেশী জাহাঙ্গীরের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছে। গণমাধ্যমকে তরুণী বলেছে, নাঈম ও জাহাঙ্গীর বিভিন্ন সময়ে তার সাথে দৈহিক সম্পর্ক করেছিল। যা প্রথমদিকে তরুণী বলেনি কিংবা ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার আর্জিতেও সে দাবী করা হয়নি। যদিও জাহাঙ্গীর বলেছেন, তার চাচাতো ভাই ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ সভাপতি তছির পাটওয়ারী পুরো ঘটনার কলকাঠি নাড়ছেন। তার সাথে জমি জমার বিরোধ থাকায় নিজের গৃহকর্মী ভিক্টিমকে ব্যবহার করে প্রথমে শিশু নাঈমকে ধর্ষন মামলায় জড়ানো হয়েছে। এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে কাজে লাগাতে তাকে(জাহাঙ্গীর) জড়ানোর চেষ্টা করছেন।
তবে মামলার আসামী শিশু নাইমের বাবা আবদুল আলী পাল্টা অভিযোগ করেন, প্রতিবন্ধী ধর্ষণ ও অন্তঃসত্বার ঘটনার সাথে তছির পাটোয়ারী নিজেই জড়িত। ওই তরুণী ও তার মা তছির পাটোয়ারীর বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতো। তাদের দাবি ডিএনএ পরীক্ষার পর তছির পাটোয়ারীর সকল অপকর্ম বেড়িয়ে আসবে। ৩টি গ্রুপের টানাটানির মধ্যেই স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি উভয়গ্রুপ থেকে ফায়দা লুটছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ সভাপতি তছির আহম্মেদ পটোয়ারী জানান, অকারনেই দুটি পক্ষ ভিক্টিম পরিবারের সাথে আমাকে জড়িয়ে টানাটানি করছে। ওই ভিক্টিমের সাথে তার পরিবারের কোন যোগ সুত্র নেই।
অপরদিকে ধর্ষক চিহ্নিত করণের দীর্ঘসূত্রিতা আর পুলিশের উদাসীনতার কারণে জন্ম হওয়া ছেলে শিশুটি পিতৃপরিচয় নিশ্চিত হচ্ছে না। শিশু সন্তান নিয়ে চরম অনিশ্চয় পরেছে প্রতিবন্ধী মা। মানবাধিকার সংস্থা গুলোর দাবি, ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পুলিশ জরুরী ভিত্তিতে প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত)মোঃ আলাউদ্দিন জানান, সন্তান জন্মের পর ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে ধর্ষক চিহ্নিত করার জন্য আবেদন করা হয়েছে। করোনা কারনে লকডাউনের জন্য এখনও ডিএনএ পরিক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ডিএনএ টেস্টেও সম্পন্ন করা হলে আসল ধর্ষক চিহ্নিত করা যাবে। মামলাটির তদন্তের স্বার্থে এখনও কিছুই বলা যাচ্ছেনা।
আরিফ হোসেন/বার্তাবাজার/পি