এক বোতল দুধ এবং একজন রিজিয়া বেগম

ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার টঙ্গাবাড়ি। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এর বাড়ির সামনের পিচঢালা পথের এক পাশে নারী-পুরুষের দীর্ঘ সারি। নির্দিষ্ট দাগে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অপেক্ষমান সবাই। সকাল ৭টা থেকেই সকলে অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের সকলের হাতে নানা বর্ণের ব্যবহৃত কোমল পানীয় এর খালি বোতল।

এই দীর্ঘ সারিতে নানা বয়সের নারী-পুরুষের সহাবস্থান। এখানে রয়েছেন ষাটোর্ধ সাফিয়া খাতুন, ৬৫ বছরের রিজিয়া বেগম কিংবা ১৩ বছরের কিশোরী রিয়া। এরা সবাই এসেছে বিনামূল্যে গরুর দুধ নিতে। প্রতিদিন সকালে এদের মতন প্রায় আড়াইশো’ অসহায় ও দরিদ্র সীমার নিচে বসবাসরত প্রান্তিক মানুষ এসে ভীড় জমায় আশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শাহাব উদ্দিন মাদবর এর বাড়ির সামনে।

বিনামূল্যে দুধ নেওয়ার লাইন। -বার্তাবাজার

আশুলিয়ার টঙ্গাবাড়িতে শাহাব উদ্দিন মাদবর এর বাড়ির সামনেই এক বিরাট গরুর ফার্ম। সেখানে দেখা গেলো কুড়িটি উন্নত জাতের গাভী। এগুলো দেখাশুনার দায়িত্বরত একজন জানালেন আরো অনেক গাভী ছিলো, কয়েকটি মারা যাওয়ায় এখন অবশিষ্ট এগুলোই রয়েছে। এসব গাভী থেকে প্রাপ্ত দুধের প্রায় সবই অসহায় মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিলিয়ে দেন শাহাব উদ্দিন মাদবর বলে জানালেন তিনি।

আবার এগিয়ে গেলাম অপেক্ষমান সেই দীর্ঘ সারির মানুষগুলোর দিকে। কথা হলো রিজিয়া বেগম (৬৫) এর সাথে। তিনি জানালেন, গত ২০ বছর ধরে প্রতি রমজান মাসের ১ম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত পুরো মাস তিনি এখানে আসেন। বিনা পয়সায় এক কেজি করে দুধ নিয়ে যান। শাহাব উদ্দিন মাদবর তার ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান স্বামী-সন্তানহীন এই অসহায় বৃদ্ধা। তার ভাত-কাপড় সহ প্রয়োজনীয় সব কিছুর ব্যবস্থা করেন এই চেয়ারম্যান।

কথা হয় ষাটোর্ধ সাফিয়া খাতুন এর সাথে। তিনি জানান, খালি দুধই না, শাহাব উদ্দিন চেয়ারম্যান সব সময়ই আমাদের দান-দক্ষিণা করে। প্রতি শুক্রবার ৫০০ করে টাকা দেয়। আর রোজার শেষের দিকে দেয় এক হাজার টাকা, সাথে ঈদের বাজার।

একই কথা জানান আনোয়ারা বেগম নামের আরেক অশীতিপর বৃদ্ধা। বয়সের ভারে ন্যূজ হয়েও কোনোমতে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। তিনি বললেন, আমগো চেয়ারমেন টাকাপয়সা দেয়, অসুখ হইলে ডাক্তার দেখায় আর যত ওষুধপত্র লাগে সব কিনা দেয়। এসময় তার হাতের খালি প্লাস্টিকের বোতল দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, গত ২০ বছর ধইরা দুধ নিই প্রত্যেক রমজানে পুরা মাস। আল্লায় (আল্লাহ) তারে ভালো রাহুক (রাখুক)।

লাইনের মাঝামাঝি দাঁড়ানো ১৩ বছরের এক কিশোরি রিয়া জানায়, তার মা অসুস্থ দেখে আজ সে দুধ নিতে আসছে। এর আগে প্রতিদিন তার মা-ই আসতো।

বর্তমান করোনার এই কঠিন সময়ে বিনামূল্যে আধা কেজি কিংবা কারও কারও জন্যে এক কেজি দুধ প্রাপ্তিতে, টঙ্গাবাড়িতে উপস্থিত প্রায় দুইশত অসহায় মানুষের সকলের চোখের ভাষায় একটা জিনিসই ফুটে উঠেছিলো, তাহলো কৃতজ্ঞতা!

আর যে মানুষটির প্রতি তাদের এই কৃতজ্ঞতা, তিনি এব্যাপারে জানালেন, ‘এই দুধ বিতরণ এটস আজকে নতুন না, প্রায় ২০ বছর ধরে প্রতি রোজায় গরীব ও অসহায় মানুষ যারা দুধ কিনে খেতে পারেনা, তাদেরকে বিনামূল্যে দুধ বিতরণ করে আসছি আমি। মূলত তাদের জন্যই আমার এই গরুর ফার্ম।এখন প্রতিদিন এখান থেকে গড়ে ৬০/৬৫ লিটার দুধ পাই। কিন্তু এই রমজানে তাতেও পোষায় না দেখে বাইরে থেকেও দুধ কিনে আনি। প্রতিদিন প্রায় দুইশত অসহায় মানুষ আমার এখান থেকে বিনামূল্যে দুধ নিয়ে যায়। শুধু রমজান মাসেই না, আমার এলাকার অনেক অসহায় মানুষ যারা কিনে খেতে পারেনা, সারাবছরই এখান থেকে দুধ নিয়ে যায়।

আশুলিয়া ইউনিয়নের এই বর্ষীয়ান ইউপি চেয়ারম্যান আরও জানান, আমি বিগত ২০ বছর যাবত আশুলিয়া ইউনিয়নবাসীর পাশে সবসময় দাঁড়াতে চেষ্টা করেছি এবং আমি যতদিন বেঁচে থাকবো ইনশাআল্লাহ ততদিন আশুলিয়া ইউনিয়নবাসীর পাশে এভাবেই থাকবো।

টঙ্গাবাড়ি এলাকার একজন রিজিয়া বেগম কিংবা সাফিয়া খাতুন অথবা অশীতিপর আনোয়ারা বেগমের হাতের এক বোতল দুধ, রাষ্ট্রের দারিদ্র্য সীমার নিচের অধিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে উদ্ভাসিত করার পাশাপাশি, রাষ্ট্রের সর্বক্ষুদ্র একক ইউনিটের এক জনপ্রতিনিধির তা ঘোচানোর অদম্য প্রয়াসের প্রতিচ্ছবিই কি নয়?

মোঃ আল মামুন খান/বার্তাবাজার/ভিএস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর