প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে পিরোজপুরে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এক ঐতিহাসিক রাজবংশ। সম্রাট আকবরের সময় যুবরাজ সেলিম (সম্রাট জাহাঙ্গীর) বিদ্রোহ করে বাংলার মুলুকে আসেন। এরপর তিনি ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও বাগেরহাট জেলার কিছু অংশ নিয়ে একটি পরগণার সৃষ্টি করেন। নিজের নামে পরগণার নাম রাখেন সেলিমাবাদ। ১৬১৮ সালে সেলিমাবাদ পরগণার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পান মদন মোহন।
১৬২৮ সালে মদন মোহন তাঁর ছেলে শ্রীনাথের নামে সেলিমাবাদ পরগণার পাট্টা নেন। শ্রীনাথ ঝালকাঠির লুৎফাবাদ গ্রামে কাচারি স্থাপন করে সেখানে বসবাস করতেন। এরপর মোগল সম্রাট শ্রীনাথকে রাজা উপাধি দেন। ১৬৫৮ সালের শ্রীনাথ রায়ের ছেলে রুদ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী পিরোজপুরের অদূরে বসবাস শুরু করেন। সেখানে জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে রাজবাড়ি ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে যে, বন-জঙ্গল কেটে রাজ্য স্থাপন করেন বলেই নামকরণ করা হয়েছে রায়েরকাঠি।
পিরোজপুর জেলা শহর থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তরে রায়েরকাঠিতে ২০০ একর জমি নিয়ে অবস্থিত এ ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ি। এখানে আছে (সাড়ে তিনশ’ বছরের পুরনো) কালী ও শিব মন্দির, ১১টি মঠ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজবাড়ি। এরই একটি মঠে স্থাপন করা হয়েছে ২৫ মণ ওজনের একটি শিবলিঙ্গ। ধারণা করা হয় কষ্টি পাথরের তৈরি এ মহামূল্যবান শিবলিঙ্গটি উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় শিবলিঙ্গ। এক সময় এ মন্দিরে মহিষ বলি দিয়ে কালীপূজা হতো। এখন প্রতি বছর পাঁঠা বলি দিয়ে কালীপূজা উদযাপন করা হয়।

ইট ও চুন-সুড়কি দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে প্রাসাদ ও মঠগুলো। কালের বিবর্তনে ধ্বংসের পথে মূল রাজবাড়ির অধিকাংশ ভবন। তবে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ১৬৬৮ সালে নির্মিত কালী মন্দির ও ৭৫ ফুট উঁচু ১১টি মঠ।
ইতিহাস গবেষক গোলাম মোস্তফার ‘সংগ্রামী পিরোজপুর’ বইয়ে পাওয়া যায়, ‘সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে যুবরাজ সেলিম বিদ্রোহ ঘোষণা করে বাংলায় আসেন। এরপর তিনি ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও বাগেরহাট জেলার কিছু অংশ নিয়ে একটি পরগনা সৃষ্টি করেন। নিজের নামে নাম রাখেন সেলিমাবাদ।’
১৬১৮ সালে সেলিমাবাদ পরগনার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পান মদন মোহন। ১৬২৮ সালে তিনি তার ছেলে শ্রীনাথের নামে সেলিমাবাদ পরগনার কিছু জমি নেন। শ্রীনাথ ঝালকাঠির লুৎফাবাদ গ্রামে কাচারি স্থাপন করে বসবাস করতেন। এরপর মুঘল সম্রাট শ্রীনাথকে রাজা উপাধি দেন।
১৬৫৮ সালের শ্রীনাথ রায়ের ছেলে রুদ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী পিরোজপুরের অদূরে বসবাস শুরু করেন। সেখানে জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে রাজবাড়ি ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে যে, বন-জঙ্গল কেটে রাজ্য স্থাপন করেন বলেই নামকরণ করা হয়েছে রায়েরকাঠি।
রাজা রুদ্র নারায়ণ কালী মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় পাঁচজন নিম্নবর্ণের হিন্দুর মুন্ডু কেটে তার ওপর মূর্তি স্থাপন করেন। রাজার এ নিষ্ঠুর ঘটনা ঢাকার প্রাদেশিক সুবেদার শাহবাজ খানের কানে পৌঁছালে রাজা রুদ্র নারায়ণকে মৃত্যুদন্ড দেন। মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার জন্য রুদ্র নারায়ণকে হাজার হাজার মানুষের সামনে বাঘের খাঁচায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
তবে খাঁচার মধ্যে লড়াই করে বাঘ মেরে ফেলেন তিনি। এ খবর সুবেদারের কানে গেলে রুদ্র নারায়ণের দন্ড মওকুফ করেন। রুদ্র নারায়ণ তার কৃতকর্মে লজ্জিত হয়ে রাজবাড়িতে না ফিরে ছেলে নরোত্তম নারায়ণ রায়কে রাজত্ব বুঝিয়ে দিয়ে কাশি চলে যান। সেখানে তিনি আমৃত্যু সন্ন্যাস জীবন পালন করেন।
একসময় রাজপ্রথা বিলুপ্ত হলে চালু হয় জমিদারি প্রথা। এতে রাজা রুদ্র নারায়ণ রায়ের উত্তরসূরীরা পরিণত হন জমিদারে। ফলে রায়েরকাঠির এ ঐতিহাসিক স্থাপনাকে কেউ জমিদার বাড়ি, কেউ রাজবাড়ি বলে থাকেন। অমরেন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন এ বংশের শেষ জমিদার।
সরেজমিনে জানা যায়, ভেঙে পড়ছে রাজবাড়ির প্রধান ফটক, প্রাসাদ, কাচারি, অতিথিশালা, নাট্যশালা, জলসাঘর, অন্ধকূপ ও মঠগুলো। নবরত্ন মঠসহ তিনটি মঠের কিছু অংশ ভেঙে পড়েছে। ভবনের গায়ে শ্যাওলা ও লতাপাতা জন্মে জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।
প্রচারণা ও পর্যটন সুবিধা না থাকায় বাড়িটি দেখতে তেমন লোকের আনাগোনা হয় না। তবে প্রতিদিনই কিছু লোক আসেন এটি দেখতে। ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করেন সপ্তদশ শতাব্দীর মনোরম নির্মাণশৈলী। প্রাচীন মঠ আর নিপুণ কারুকার্য খচিত এই জমিদারবাড়িটি দেখে পর্যটকরা মুগ্ধ হতে বাধ্য।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর ঐতিহাসিক রাজবাড়ি ও মঠ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলে একদিকে যেমন স্থানটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে; অন্যদিকে রায়েরকাঠি হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম পর্যটন স্থান।
নাছরুল্লাহ আল কাফী/বার্তাবাজার/পি