ক্ষমতা দুই দিনের। মহামারী জানিয়ে দিয়েছে দুনিয়াটা আসলেই ক্ষণস্থায়ী। ক্ষমতার বড়াই করে কী হবে? পেশাগত জীবনে অনেক মন্ত্রী, এমপি, দাপুটে সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ক্ষমতাধর, আমলা কামলা দেখেছি। ক্ষমতায় থাকাকালে কথা বলতে পারেন না অহংকারে। ক্ষমতা শেষ হলে বিড়ালের মতো চুপসে যান। কথাও বলেন চোরা চোরা চোখে।
বছর তিন আগের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি আধুনিক মানুষ। চিন্তা-চেতনায় প্রগতিশীল। টক শোয় বড় বড় কথা বলেন। তিনিই আমাকে প্রথম বললেন হেফাজত ক্ষমতার স্বপ্ন দেখে। সংসদে যেতে চায়। তিনিসহ অনেক শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। আগামী নির্বাচন ঘিরে তাদের একটা স্বপ্ন আছে।
বুঝতে পারলাম হেফাজত একদল সাদাকালো বুদ্ধিজীবীর কবলে পড়েছে। সর্বনাশা বুদ্ধি নিয়ে বারোটা বাজাবে নিজেদের এবং দেশের। কিছু মিডিয়ার পন্ডিত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অধ্যাপক সাহেবরা কী পরামর্শ দিয়েছিলেন জানি না। রাজনৈতিক দলের একটা স্বচ্ছতা থাকে। অরাজনৈতিক জঙ্গি ধ্বংসাত্মক চিন্তায় দেশের জন্য কিছু করা যায় না। তারা ভেবেছিল সমঝোতার ভাবে থেকে যা খুশি তা করতে পারবে।
সরকার উচ্ছেদের ঘোষণা দিতে পারবে, মিডিয়ার গাড়ি ভাঙচুর, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নারী সাংবাদিককে হেনস্তা, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিচিহ্ন পোড়াতে পারবে। কেউ কিছু বলবে না। কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ওপর প্রথম আঘাত হেনে ঔদ্ধত্যের সূচনা। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণ হলে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার ঘোষণাসহ অনেক কান্ড ঘটিয়েছেন। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। ভেবেছেন সমঝোতার নামে সরকারের কাছ থেকে অনেক নিয়েছেন। হুমকি-ধামকি তান্ডব করে ক্ষমতা নেবেন।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে শেখ হাসিনা লাগাম টেনেছেন। হেফাজত এখন টের পাচ্ছে বাস্তবতা কঠিন। প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, ‘বাঘে ধরলে ছাড়ে, শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়েন না।’
সেদিন এক বন্ধু ফোন করলেন। বললেন, কান্ড দেখেছেন, মামুনুল হক আটকের পর সারা দেশে কোনো সভা-সমাবেশ হয়নি। অথচ সে রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সয়লাব মিছিল বিক্ষোভের ভিডিও আর ছবি দিয়ে। কী কারণে এ মিথ্যাচার জানি না। সরকার প্রথম দুই দিন ঘুমিয়ে ছিল। পরে অবশ্য র্যাব-পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে গুজব ছড়ানোর দায়ে। ডিজিটাল দুনিয়া এখন আওয়ামী লীগের বিরোধী শিবিরের হাতে। যা খুশি তা হচ্ছে, দেখার কেউ নেই। এমনকি পাল্টা জবাবও নেই।
আইসিটির টপ আমাকে বার্তা দিলেন, এসব দেখার দায়িত্ব তাঁর নয়, অন্যদের। যৌক্তিক কথা। রাজনৈতিক সরকারের মন্ত্রীদের কাজটা কী? কিছু দিন আগে জিটিভিতে ধারাবাহিক রিপোর্ট দেখছিলাম আইসিটি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে লুটপাট কীভাবে হয়। কাজ না করেই ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে কীভাবে বিল নিয়ে যায়। রিপোর্টার সংশ্লিষ্ট ঠিকানা ঘুরে ঘুরে কাজ না করে বিল নেওয়া কাউকে পাননি। এ রিপোর্ট দেখার পর বুঝতে পারলাম আইসিটির কাজ কী! ভালো। আদবকায়দা দেখিয়ে সবাইকে বিমোহিত করে রাখাও একটা বড় সাফল্য।
অনেক দিন পর ’৯৬ সালের সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদের কথা মনে পড়ছে। দাপট আর ক্ষমতার শেষ ছিল না। চোখের সামনে দেখেছি নাঙ্গলকোটের এমপি জয়নাল আবেদীন ভূইয়া আর মির্জা আজম তথ্য প্রতিমন্ত্রীর অফিসে গেলেন। তিনি অফিসে থেকেও দুই এমপিকে ঢুকতে দেননি। সে সময় তিনি অন্য গল্পগুজবে ছিলেন। সরকারের মেয়াদ শেষে বিএনপি বানাল ‘শাবাশ বাংলাদেশ’। আওয়ামী লীগবিরোধী সর্বোচ্চ ভিজুয়াল প্রচারণা। কাজ করতাম এটিএন বাংলায়। একদিন আমার কাছে এলেন সাবেক কূটনীতিক মাহমুদ আলী (গত মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ও যুগ্মসচিব আজিবুর রহমান (পরে তথ্য কমিশনার)। দুজনই বললেন, নেত্রী পাঠিয়েছেন শাবাশ বাংলাদেশের পাল্টা কিছু করার জন্য। আমার পরামর্শ চান তারা। বললাম, সাইয়িদ সাহেবের কাছে যান। তিনি মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। জবাবে দুজনই বললেন, তিনি কিছু করেননি। ভোট করতে গেছেন এলাকায়। সে ভোটে অবশ্য হেরেছিলেন। তাদের নিয়ে গেলাম সৈয়দ বোরহান কবীরের অফিসে। বানানো হলো ‘জয় বাংলার জয়’। এটিএন বাংলায় দুটি অনুষ্ঠানই প্রচার হয়। কিন্তু ‘শাবাশ বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানটি দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে নির্মাণ করা। হঠাৎ তৈরি করা ‘জয় বাংলার জয়’ কোনো অবস্থানই পেল না দর্শকের কাছে। এখনকার মন্ত্রী সাহেবরা দায়িত্ব নেন না। তারা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতিতে আছেন। সবাই তাকিয়ে থাকেন একজনের দিকে। তারা বোঝেন না দায়িত্ব দিলে পালন করতে হয়। তাদের আগেও অতীতে অনেকে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। আর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করার কারণেই ছিটকে পড়েছেন। ’৯৬ সালের দিকে গেলাম না। ২০০৯ সালের পর থেকে কত মন্ত্রী এলেন-গেলেন হিসাব নেই।
বঙ্গবন্ধুর মেয়েকে কাছ থেকে দেখেছি। তাঁর মন্ত্রীরা দায়িত্ব না নিলেও তিনি সবকিছুরই দায়িত্ব নেন। কোনো কিছু পাশ কাটিয়ে যান না। সংকট-সমস্যা, জীবন-মৃত্যু কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করেন না। এ মুহূর্তে মহামারীর কারণে হয়তো তিনি বের হন না। কিন্তু সবকিছুই মনিটর করেন কঠোরভাবে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন নির্ভীকচিত্তে। একটা নিজস্ব ক্যারিশমা ও স্টাইল নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন। ধরে রেখেছেন সবকিছু। তাঁর পথচলা হাজার কিলোমিটার গতির। জানেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত কর্মী বাহিনী তাঁর পাশে আছে, থাকবে। বিপদ দেখলে সবাই ভিতরের হতাশা কাটিয়ে তাঁর প্রশ্নে আরও আপসহীন হবেন।সূত্র- বাংলাদেশ প্রতিদিন। (সংক্ষেপিত)
লেখক: নঈম নিজাম; সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
বার্তা বাজার/এসজে