রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির আট বছর: বিচার ৮ কদমও আগায়নি

সারাবিশ্বের মানবতার বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া ঘটনার মধ্যে একটি রানা প্লাজা ধস। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঘটা এই মহাবিপর্যয়ের ৮ বছর পূর্ণ হলো আজ। সরকারি হিসেব মতে ১ হাজার ১৩৬ জন এই ঘটনায় মারা গেলেও দোষীদের কারও বিচার হয়নি। অগ্রগতি হয়নি বিচার কাজেরও। এ ঘটনায় হওয়া মূল মামলায় পাঁচ বছর আগে বিচার শুরু হলেও এখনও কোনো সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।

এই ঘটনায় ভবনের মালিক রানা, তার পরিবার, সাভারের তখনকার মেয়রসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করে ৫টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে দুদক বাদী হয় ৩টির বাকি দু’টির মাঝে একটির বাদী পুলিশ ও অপরটিতে রাজউক।

সম্পদের হিসাব দাখিল না করায় ২০১৭ সালের ১৯ আগস্ট ৩ বছর কারাদণ্ড হয় রানায়। ৫০ হাজার টাকা জরিমান অনাদায়ে দেওয়া হয় আরও ৩ মাসের কারাদণ্ড। দুদকের মামলায় বিচার হলেও ভবন ধসের ঘটনায় মূল মামলার বিচারে অগ্রগতি নেই। এ ঘটনায় হওয়া দুটি মামলাতেই পাঁচ বছর আগে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। তবে উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশের কারণে এ মামলায় দীর্ঘ এ সময়েও কোনো সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় সাভার থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওয়ালী আশরাফ ভবন নির্মাণে ‘অবহেলা ও ত্রুটিজনিত হত্যা’ মামলা করেন। ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে রানার বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়।

২০১৬ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ এস এম কুদ্দুস জামান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর প্রায় পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।

জানা যায়, সাভার পৌরসভার তৎকালীন মেয়র রেফায়েত উল্লাহ এবং তৎকালীন কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী খানের পক্ষে মামলাটি হাইকোর্টে স্থগিত থাকায় পুরো সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া স্থগিত আছে। রানা প্লাজা ধস হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ৪১ আসামির মধ্যে বর্তমানে কারাগারে আছেন কেবল ভবনের মালিক সোহেল রানা। বাকি আসামিদের মধ্যে জামিনে আছেন ৩২ জন, পলাতক ছয়জন এবং মারা গেছেন দুইজন।

সোহেল রানার আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ বলেন, রানার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মূল মামলার অভিযোগ গঠন হয় পাঁচ বছর আগে। ঘটনার পরপরই রানাকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে কোনো সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি, তাকে জামিনও দেওয়া হয়নি।

অপরদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মিজানুর রহমান বলেন, হাইকোর্ট এ মামলার অভিযুক্ত ৮ আসামির কার্যক্রম স্থগিত করেছিল। ছয় জনের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়েছে। বাকি দুজনেরটা দ্রুতই প্রত্যাহার হবে বলে আশা করছি। এরপরই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে বলে আমরা আশা করছি।

রানা প্লাজা ধসের পর ইমারত নির্মাণ আইন না মেনে ভবন নির্মাণ করায় রাজউকের কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন ওইদিন সাভার থানায় মামলাটি করেন। ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবনের মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

২০১৬ সালের ১৪ জুন ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। অভিযোগ গঠনের ওই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন আসামি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন।

যার মধ্যে নিউওয়েব বটমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বজলুস সামাদ ও সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের রিভিশন আবেদন নামঞ্জুর হয়েছে। অপরদিকে নিউওয়েব বটমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বজলুস সামাদ ও সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের রিভিশন আবেদন নামঞ্জুর করায় তাদের বিরুদ্ধে বিচার চলতে বাঁধা নেই।

অন্য আসামিদের রিভিশন এখনও নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলার কার্যক্রম স্থগিত আছে। তাই এ মামলায়ও কোনো সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ারুল কবির বাবুলের আশা শিগগিরই এ মামলায় বাকি রিভিশনগুলো নিষ্পত্তি সাপেক্ষে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে ধসে পড়ে সাভারের রানা প্লাজা ভবন। ওই ঘটনায় এক হাজার ১৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত ও পঙ্গু হন প্রায় দুই হাজার শ্রমিক। দুই হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

বার্তা বাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর