দেশে চলছে কঠোর লকডাউন। সব কিছু বন্ধ থাকার কথা দাবির মুখে চালু রাখা হয়েছে দেশের লাখ লাখ মানুষের কর্মস্থল শিল্পকারখানা। রাজধানীর মহাসড়কে গণপরিবহন থাকলেও ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাফিক পুলিশকে দেখা যায় হিমশিম খেতে।
কিন্তু লকডাউনে প্রায় সকল ধরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে ব্যবসায়ীরা আর্থিক অনটনে পড়ছেন। বিশেষ করে যারা ফুটপাতে ক্ষুদ্র ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তাদের অবস্থা আরও করুণ।
রাজধানীর ফার্মভিউ সুপার মার্কেটের সামনে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে প্যান্ট-শার্টের ব্যবসা করতেন আনিসুর রহমান। সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস এই স্বল্প আয়ের ব্যবসাটি। তবে লকডাউনে তা থেমে গেছে। বিকল্প কিছু খুঁজেও পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় কাছে থাকা অল্পকিছু জমানো টাকা আর ধারদেনা করে কোনোমতে চলছে তার সংসার। খেয়ে ফেলছেন ব্যবসার মূলধনও। এমন পরিস্থিতি আর কিছুদিন থাকলে তার পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না বলে জানান তিনি। শুধু আনিসুর নন, লকডাউনে এমন লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মহাসংকটের মধ্যে পড়েছেন।
ব্যবসা বন্ধ করে বেশির ভাগই গ্রামে ফিরে গেছেন। ব্যতিক্রম দুই একজনের বিকল্প ব্যবস্থা হলেও অধিকাংশরাই ব্যবসা হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
সরজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর ফার্মগেট, গ্রিনরোড, পান্থপথ, এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর এবং মিরপুর এলাকায় যেসব জায়গায় ফুটপাথে বসে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিকিকিনি করতেন, সেসব এলাকা যেন এখন নিস্তব্ধ। এসব জায়গায় ব্যবসা করে সংসার চালাতেন লাখ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তবে লকডাউনে এখন সব বন্ধ।
অন্যদিকে দোকান কেন্দ্রিক লাখ লাখ ব্যবসায়ীও একই হাল। দোকানপাট বন্ধ থাকায় একদিকে লোকসানে মালিকরা, অন্যদিকে কর্মচারীরা কাজ হারিয়ে বেকার। এমনিতেই মহামারির কারণে গত বছর থেকেই ব্যবসায় মন্দাবস্থা। দ্বিতীয় দফায় করোনার ধাক্কায় নতুন করে মহাসংকটে পড়েছে এই ব্যবসা খাত।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ৫৩ লাখ ৭২ হাজার ৭১৬। এসব ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর বৈশাখ, রমজান ও ঈদ কেন্দ্রিক প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করে থাকেন। কিন্তু এবার লকডাউনে এসব ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানান, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দীন আহমেদ।
তিনি বলেন, ফুটপাথে ব্যবসা করা অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যেমন ব্যবসা বন্ধ করে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন, তেমনি দোকান কেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন মহাসংকটে।
করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে গত ৫ই এপ্রিল থেকে চলাচলে এক সপ্তাহের বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। পরে ১৪ই এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় দফা এবং সবশেষে ২১শে এপ্রিল থেকে তৃতীয় দফায় লকডাউন আরোপ করা হয়। এ অবস্থায় মার্কেট, দোকানপাট ও বিপণিবিতান বন্ধ থাকায় পয়লা বৈশাখ, রমজান, ও ঈদ কেন্দ্রিক বাণিজ্য থেকে বঞ্চিত লাখ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, দোকানপাট বন্ধ থাকায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিবছর বৈশাখ, রমজান ও ঈদ কেন্দ্রিক বড় পরিসরে ব্যবসা হয়। এতে ব্যবসায়ীরা ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করে থাকেন। শুধু পয়লা বৈশাখে ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এ ছাড়া রমজান ও ঈদে আরো ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়। সবমিলিয়ে ৪০-৫০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে। কিন্তু লকডাউনের কারণে সব ব্যবসা বন্ধ।
তিনি আরও বলেন, লকডাউনের আগেই তারা বিনিয়োগ করেছিল। এখন ব্যবসা বন্ধ থাকায় বিনিয়োগের টাকা আর ফেরত আসবে না। ফলে বিনিয়োগের পুরো টাকাই তাদের লোকসানে চলে যাবে। দিনে অন্তত ১ হাজার ৭৪ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা আরো ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এই পরিস্থিতিতে জীবন ও জীবিকা দুটিই প্রয়োজন। তাই স্বাস্থ্য বিধির বিষয়টি নিশ্চিত করে সব দোকানপাট খুলে দেয়া এবং অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ফুটপাথে ব্যবসা করার সুযোগ করে দেয়ার দাবি জানান এই ব্যবসায়ী নেতা। সূত্র- মানবজমিন।
বার্তা বাজার/এসজে