খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন টাঙ্গাইলের যৌনকর্মীরা

লকডাউনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর যৌনপল্লী টাঙ্গাইলের কান্দা পাড়ায় ‘খরিদ্দার’ আসা-যাওয়া বন্ধ থাকায় উপার্জন হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

জানা যায়, ২০০ বছরের পুরনো কান্দাপাড়া যৌনপল্লীটি ৩০২ শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর ৫৯টি বাড়িতে প্রায় ৭০০-৮০০ যৌনকর্মী রয়েছেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত বছরের ২০ মার্চ জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে প্রতিজনকে ৩০ কেজি করে চাল দিয়ে এই পল্লী লকডাউন ঘোষণা করে। এরপর ঈদুল ফিতরের আগে প্রতি সদস্যকে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নগদ ৫০০ করে টাকা দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, লকডাউনের কারণে কান্দাপাড়া যৌনপল্লীর প্রতিটি অলিগলির রাস্তা ফাঁকা। যৌনকর্মী ছাড়া আর কেউ নেই ওই এলাকায়। আবার অনেকেই কক্ষ ছেড়ে দেওয়ায় অনেকের বাড়িতে তালা ঝুলানো দেখা গেছে।

করোনা সংক্রমণের শুরুতে যৌনকর্মীরা জেলা প্রশাসকের সহায়তায় গত বছর ত্রাণ সহায়তা পেলেও এবারের লকডাউনে এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তা পাননি। কান্দা পাড়ায় যৌনপল্লীতে জৈবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ এ পল্লীতে আসা-যাওয়া করেন। ফলে দ্বিতীয় দফায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে সর্বাত্মক লকডাউনে পল্লীতে খরিদ্দার আসা বন্ধ হয়ে গেছে। বিপাকে পড়ছেন যৌনকর্মীরা।

এদিকে খরিদ্দার না আসায় খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন যৌনকর্মীরা। কোনো রকমে ধারদেনা করে চলছে তাদের জীবন জীবিকা এবং পার করছেন অলস সময়।

যৌনকর্মীরা বলছেন, গতবছরের লকডাউনে তারা জেলা প্রশাসকের কাছ ত্রাণ সহায়তা পেয়েছেন। কিন্তু এবারের লকডাউনে এখন পর্যন্ত কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাননি। এখন ‘খরিদ্দার’ না আসাতে হচ্ছে না আয় রোজগারও। সন্তান-সন্ততি নিয়ে ধারদেনা করে কোনো রকম খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন। এভাবে তাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। সরকারের কাছে ত্রাণ সহায়তার অনুরোধ জানান তারা।

পল্লীর ভেতরে থাকা এক ব্যবসায়ী বলেন, পল্লীর মেয়েদের নিয়ে তাদের ব্যবসা। এখন মেয়েরাই ভাত পাচ্ছে না। এবার এখন পর্যন্ত কেউ তাদের সহযোগিতা করেনি। মহাজনদের থেকে বাকি এনে মেয়েদের দিচ্ছেন। কিন্তু কষ্ট সবার হচ্ছে। মেয়েরা কোনো সহযোগিতা পেলে তারাও ভালো থাকতেন।

যৌনকর্মী পিংকি আক্তার বলেন, ‘খরিদ্দার’ না থাকায় কষ্ট বেড়ে গেছে অনেক। চোখের লজ্জায় কারও কাছে অভাবের কথা বলতেও পারি না। ঘরে খাবার না থাকায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি। আয় রোজগার না থাকায় পল্লীর ভিতরের সদস্যদের কাছ থেকে তাদের পুরাতন জামা কাপড় এনে পরছি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক নারী যৌনকর্মী বলেন, দেহব্যবসা ছাড়া অন্য কোনো কাজ শিখিও নাই পারিও না। এই কাজ করে নিজের সব খরচের পাশাপাশি বাড়ির বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ঔষুধ কেনার জন্য মাসে সাড়ে চার-পাঁচ হাজার করে টাকা দিতে হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ যাবত তাদের টাকাও দিতে পারি না। তারা টাকা চেয়ে কান্না করেন। আমি টাকা না দিতে পেরে কান্না করি। সরকারি কোনো সহযোগিতা পেলে রোজার মাসটা কোনোভাবে কাটাতে পারতাম।

নারী মুক্তি সংঘের আকলিমা আক্তার বলেন, এই যৌনপল্লীর সদস্যরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। লকডাউনের কারণে ‘খরিদ্দার’ না থাকায় বাড়িভাড়া, খাবার খরচসহ ব্যক্তিগত খরচ জোগাতে না পেরে প্রায় ৪০-৫০ জন কর্মী পল্লী ছেড়ে তাদের বাড়িতে চলে গেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক নারীনেত্রী বলেন, আগের লকডাউনে জেলা প্রশাসক যৌনকর্মীদের সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু এবার কেউ আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। লকডাউন বাড়লে এখানকার কেউ করোনায় মারা যাবে না। মারা যাবে না খেয়ে। তিনি আরও বলেন, সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য কত কিছু করছে। আর তারা তো এদেশের নাগরিক। তাই যৌনকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে সরকারকে অনুরোধ জানান তিনি।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. মো. আতাউল গনি বলেন, পতিতা পল্লীসহ অন্যান্য পেশার যারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন সরকারিভাবে তাদের সহায়তা দেওয়া হবে।

হাসান সিকদার/বার্তাবাজার/পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর