উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হলেন সাবেক ছাত্রদল নেতা
অদৃশ্য শক্তির জোরে ছাত্রদল থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের সদ্য ঘোষিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক নূরুল মোস্তফা। জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সরাসরি তার পক্ষে অবস্থান নেওয়াতে ক্ষোভ বেড়েছে তৃণমূল নেতা কর্মীদের মাঝে।
অভিযোগ ওঠেছে নূরুল মোস্তফাকে বহাল রাখতে তার ভাইপো উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়কের নেতৃত্বে মাঠে নেমেছে একটি গ্রুপ। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের নেতাদের মাঝেও চলছে পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান।
গত ১৩ এপ্রিল টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম মুন্নাকে সভাপতি ও নূরুল মোস্তফাকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে একটি কমিটি অনুমোদন দেয় কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগ। এতে বিপত্তি বাঁধে সম্পাদক নূরুল মোস্তফাকে নিয়ে। জেলা বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির নেতা কর্মীদের সাথে নূরুল মোস্তফাসহ সৌজন্য সাক্ষাতের কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তার সূত্র ধরে তৃনমূল নেতাকর্মী ও সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে নূরুল মোস্তফার পরিচয় এবং নেতৃত্বে আসার বিষয় নিয়ে সৃষ্টি হয় আরও বেশী ধুম্রজাল । তাদের দাবি, নুরুল মোস্তফাকে কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক মাঠে দেখা যায়নি এবং কি তার রাজনৈতিক পরিচয়?

নূরুল মোস্তফা ছবিগুলোকে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের বলে দাবি করলেও পরবর্তীতে ছাত্রদল করার পক্ষে আরও কিছু প্রমাণ বেরিয়ে আসে। বিষয়টি আলোচনায় আসার পর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মারুফ আদনান তার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।
এ ব্যাপারে অনুসন্ধান শুরু হলে, নূরুল মোস্তফা ২০১৬ সালে ছাত্রদলের হ্নীলা (উত্তর) শাখার ওয়ার্ড কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন এমন একটি অনুমোদিত কমিটি বার্তা বাজারের হাতে এসেছে। পরের দিন, তার ভাইপো অর্থাৎ সেই সময়ের হ্নীলা ইউনিয়ন (উত্তর) শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব এবং বর্তমান উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়ক হারুন-উর রশিদ ফেইসবুক লাইভে এসে বিষটি ভূয়া বলে চাচার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।

তার বিপরীতে ওই কমিটির আহবায়ক মোহাম্মদ শাহীন তার ব্যক্তিগত ফেইসবুকে হারুন-উর রশিদের বক্তব্যের বিরোধীতা করেন এবং তাকে ওয়ার্ড কমিটির সাধারণ সাধারণ সম্পাদক বলে জোরালো দাবী তুলেন।
নিজ দলীয় নেতা কর্মীদের বরাত দিয়ে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহদাত হোসেন রিপন, নূরুল মোস্তফা ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলে নিশ্চিত করেছেন।
কে এই নূরুল মোস্তফা?
উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের মৌলভী বাজার এলাকায় নাগু মিয়ার ছেলে তিনি। চট্টগ্রাম কাজেম আলী স্কুলে সাবেক ছাত্র। পরবর্তীতে কক্সবাজার সরকারী কলেজে এসে স্নাতক পড়াশুনা শুরু করেন।
স্থানীয়দের মতে, নূরুল মোস্তফা একজন জামায়াত-বিএনপি রাজনৈতিক মতাদর্শ অবলম্বনকারী পরিবারের সন্তান। তার বড় ভাই নাছির উদ্দীন হ্নীলা ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক যুগ্ন-আহবায়ক। সাবেক হ্নীলা (উত্তর) শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ও টেকনাফ উপজেলা ছাত্রদলের বর্তমান আহবায়ক হারুন-উর রশিদের চাচা এবং হ্নীলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাবেক জামায়েতের আমির মৃত মীর কাশেম মাষ্টারের চাচাতো ভাই।

বিএনপি পরিবারের ছেলে হিসেবে উপজেলা ছাত্রলীগে রাজনীতি চর্চার সুযোগ না পেয়ে ভিরেছিলেন কক্সবাজারের কিছু ছাত্রলীগ কর্মীদের সাথে। সেখানে দলাদলি না থাকার কারণে জেলা ছাত্রলীগের নেতাদের সাথে সুকৌশলে ছবির পোজ দিয়ে নিজেকে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে প্রতিষ্টা করার চেষ্টা করেন।
এ বিষয়ে নুরুল মোস্তফা বার্তা বাজারকে বলেন, তার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা বানোয়াট গল্প। এই বিষয়ে যারা অভিযোগ তুলেছেন তারা সবাই ইয়াবা কারবারি। তারা ছাত্রলীগকে ইয়াবাকারবারীরদের হাতে তুলে দিতে মিশনে নেমেছেন।
জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মারুফ আদনানের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে, তিনি নুরুল মোস্তফার পক্ষ সাফাই গেয়ে সব কিছু তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দাবী করেন।
অভিযোগ প্রমাণ হলে সাংগঠনিক কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে বলেন, এসব কখনও প্রমাণ করতে পারবেনা, কারণ আমি দীর্ঘদিন ধরে তাকে চিনি বলে দাবী করে পাশ কেটে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার পক্ষে এতো জোরালো অবস্থানের ব্যাপারে পরিষ্কার কিছু বলতে পারেননি।
তার এই বক্তব্যে, উপজেলা ছাত্রলীগের নেতাদের তোলা দাবি মতে সাধারণ সম্পাদক মারুফের হাত ধরেই সে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশের বিষয়টি অনেকটা পরিষ্কার হওয়া গেছে।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আবু সালমান প্রধান শাওন ‘বার্তা বাজার’কে বলেন- তৃণমূল নেতাদের বাদ দিয়ে অন্য দল থেকে এসে পদ বাগিয়ে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি তদন্তে প্রমাণ মিলে তাহলে প্রশ্রয়দাতাসহ তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক গঠনতন্ত্র মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক পদস্থ নেতৃবৃন্দরা ‘বার্তা বাজার’কে বলেন- উপজেলা ছাত্রলীগে নেতৃত্ব দেয়ার মতো অন্তত ৫০ জন নেতা রয়েছে। ২৩ ফেব্রুয়ারী বর্ধিত সভা চলাকালে সকল প্রার্থীদের বায়োডেটা জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলো জেলা ছাত্রলীগ। একইদিন সভায় স্বশরীরে হাজির থেকে যারা বায়োডাটা জমা দিবেনা পরবর্তীতে তারা কোনো ভাবেই প্রার্থী হওয়ার সুযোগ হারাবে বলে ঘোষণা দেন। কিন্তু নুরুল মোস্তফা সেদিন তোপের মুখে পড়ার ভয়ে বর্ধিত সভায় হাজির হয়নি। তাহলে সে কিভাবে প্রার্থী হলো সেটাও প্রশ্ন তুলেন তারা।

তারা আরও বলেন, জেলা ছাত্রলীগ এতো দিন কমিটি ঘোষণা না করে, বিতর্কিত এই ছাত্রদল কর্মীকে দিয়ে কমিটি ঘোষণা দিলে তৃ্ণমূল নেতারা আন্দোলন করবে জেনে লকডাউনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কমিটি ঘোষণা দিয়েছেন।
তাদের দাবী, তার বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ কেন্দ্রীয় ভাবে তদন্ত করা হোক। তদন্তে এসব অভিযোগ ভূল প্রমাণিত হলে তাকে অভিনন্দন। যদি সত্য প্রমাণিত হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হোক। একই সাথে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মারুফকে নুরুল মোস্তফার বিরুদ্ধে অবস্থান না নেয়ার জন্য উপজেলা ছাত্রলীগ নেতাদের নিষেধ করা বন্ধ করতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষন করেন।
বার্তা বাজার/এসজে