মহামারি করোনা ভাইরাসের তান্ডব যেন কমছেই না। উদ্বেগজনক হারে বাড়তেই আছে। দিন যত যাচ্ছে, হাসপাতালে রোগীর চাপ ততই বাড়ছে। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের দক্ষিণ আফ্রিকান ও যুক্তরাজ্য ভ্যারিয়েন্ট দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভ্যারিয়েন্টের চরিত্র ভয়াবহ।
রোগীকে দ্রুত কাবু করে ফেলছে, দেখা দিচ্ছে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট এবং অস্বাভাবিক আচরণ, যা গত বছর করোনা রোগীদের মধ্যে তেমন দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা বলছেন, এখন হাসপাতালে ভর্তি করোনা রোগীদের ৮০ শতাংশেরই অক্সিজেনের প্রয়োজন হচ্ছে। অথচ গত বছর করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশের অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়েছিল।
এমন পরিস্থিতিতে আজ থেকে আট দিনের লকডাউন শুরু হচ্ছে। মানুষ ঈদযাত্রার মতো ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে গেছে। কোথাও স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, মাস্ক পরছে না। এতে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমরা হতাশ! জীবন বাঁচলে জীবিকা হবে। আর জীবন বাঁচাতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’ তারা আরো বলেন, হাসপাতালে যারা ভর্তি হচ্ছেন, তাদের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রকৃত মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেশি। মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান জানতে হলে শশ্মানঘাট ও কবরস্থানে যেতে হবে। সেখানে প্রতিদিন অনেক মরদেহ দাফন করা হচ্ছে, যার মধ্যে অধিকাংশই করোনা রোগীর।
এদিকে দেশে করোনা ভাইরাসে গত এক দিনে আরো ৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে; এই সময়ে করোনা ভাইরাসে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৬ হাজার ২৮ জন। টানা তিন দিন দৈনিক ৭০ জনের বেশি মৃত্যুর পর গতকাল মঙ্গলবার তা কমল। সোমবার ৮৩ জন, রবিবার ৭৮ জন এবং শনিবার এক দিনে ৭৭ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, লকডাউন সামনে রেখে গত কয়েক দিন যেভাবে মানুষ বাড়িতে যাচ্ছে, সেটা সত্যিই হতাশাজনক। ঢাকা থেকে সংক্রমিত হয়ে গ্রামের মানুষকে আক্রান্ত করে তারা আবার ঢাকায় চলে আসবে। এভাবে চললে সংক্রমণ বাড়তেই থাকবে। আর সংক্রমণ বাড়লে মৃত্যুর হারও বাড়তেই থাকবে। এখনো সময় আছে সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, বেঁচে থাকলে জীবিকা হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, মানাতে হবে। অসুস্থ হলে নিজে কর্মক্ষমতা হারাবেন, পরিবারকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেবেন। তাই নিজেদের স্বার্থেই সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।
বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, বেঁচে থাকার জন্য জীবিকার প্রশ্নে মাত্র এক-দুই সপ্তাহ ছাড় দিতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। দুর্ঘটনায় হাত-পা ভেঙে গেলে তো মাসের পর মাস বাসায় থাকতে হয়। তিনি বলেন, মৃত্যুর মিছিল দেখতে চাইলে শশ্মানঘাট ও কবরস্থানে যান। সেখানে সারি সারি লাশ। তাই বাঁচতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নামজুল হক বলেন, ‘এখন করোনা রোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। সামাল দিয়ে যাচ্ছি। অক্সিজেনেরও ব্যাপক চাহিদা। এই হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা আছে।’
মুগদা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, ‘জীবন আগে, জীবিকা পরে। সবাই মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে চলাফেরা করছি। বাঁচতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে।’
শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমান বলেন, প্রতিদিন করোনার রোগীর চাপ বাড়ছে। সামাল দেওয়া কঠিন। হাসপাতালে ভর্তি করোনা রোগীদের মধ্যে ৮০ শতাংশেরই অক্সিজেনের প্রয়োজন হচ্ছে। গত বছর এই হার ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। বর্তমানে অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সব সরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীদের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশেরই অক্সিজেনের প্রয়োজন হচ্ছে। মাঝে মাঝে কোনো কোনো হাসপাতালে অক্সিজেনের সংকট থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
বার্তাবাজার/ই.এইচ.এম