মমতাজকে ডিগ্রি দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টির বৈধতা নেই

বাংলা লোকসংগীতের জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম ভারতের তামিল নাড়ু প্রদেশের গ্লোবাল হিউম্যান পিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন থেকে সন্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছেন বলে দেশের গণমাধ্যম জুড়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে।

কিন্তু এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে ভারতে গ্লোবাল হিউম্যান পিস ইউনিভার্সিটি নামে বৈধ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নাই। তবে এই নামে অনলাইনে একটি ওয়েবসাইট পাওয়া গিয়েছে যারা অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে থাকে। যেটা ভারতের দ্যা ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন (ইউজিসি) অ্যাক্ট- ১৯৫৬ অনুযায়ী অবৈধ।

বাংলা সংগীতের মহাতারকা মমতাজ বেগম তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে দেওয়া এক পোস্টে লিখেন- ভারতের তামিলনাড়ুর “গ্লোবাল হিউম্যান পিস ইউনিভার্সিটি” গত শনিবার ১০ এপ্রিল ২০২১ বাংলাদেশের ফোক সম্রাজ্ঞী এবং মাননীয় সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করে। সারা পৃথিবীতে একমাত্র সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে প্রকাশিত আট শতাধিক অ্যালবামের বিশ্ব রেকর্ড, সুদীর্ঘ ত্রিশ বছর যাবত বাংলা গানকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা, লোকজ সঙ্গীতকে আধুনিকায়ন করে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য করা, চলচ্চিত্র সঙ্গীতে একাধিকবার জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তি তথা দেশী বিদেশী অসংখ্য সম্মাননা অর্জন, সমাজ সচেতনতামূলক নানামুখী গানের মাধ্যমে বিশেষ ভূমিকাসহ সার্বিক মূল্যায়নে মমতাজ বেগমকে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ডঃ পি ম্যানুয়েল সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব মিউজিক’ পদকে ভূষিত করেন।

ঠিক এমন সংবাদই দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। সবগুলো গণমাধ্যমের বক্তব্য প্রায় এক রকম। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে ভারতের দ্যা ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন (ইউজিসি) অ্যাক্ট- ১৯৫৬ এর সেকশন ২২(১) অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় অথবা রাজ্য সরকার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, অথবা ইউজিসি অ্যাক্ট-১৯৫৬ এর ৩ এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়, অথবা সংসদীয় কোনো আইনের আওতায় প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানই শুধু ডিগ্রি প্রদান করতে পারবে।

ইউজিসি অ্যাক্ট-১৯৫৬ এর সেকশন ২৩ এ বলা হয়েছে, উপরিউক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়া আর কেউ “বিশ্ববিদ্যালয়” শব্দটি ব্যবহার করতে পারবে না। গ্লোবাল ‍হিউম্যান পিস বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের ইউজিসি অ্যাক্ট-১৯৫৬ অনুযায়ী কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই নয় এবং এটি কোনো ডিগ্রিও প্রদান করতে পারে না।

ভারতে মোট বিশ্ববিদ্যলয় রয়েছে ৯৭৯টি। যাদের মধ্যে কেন্দ্র পরিচালিত ৫৪টি, রাজ্য পরিচালিত ৪২৫টি, বেসরকারি ৪২৫টি ও উজিসি অ্যাক্ট-১৯৫৬ এর তিন সেকশন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গণ্য করা হয় আরও ১২৫টি প্রতিষ্ঠানকে। এগুলোর মধ্যে মমতাজ বেগমকে ডিগ্রি দেওয়া গ্লোবাল হিউম্যান পিস ইউনিভার্সিটির নাম খোঁজে পাওয়া যায়নি। তালিকাটি দেখতে ক্লিক করুন

 

মমতাজ বেগমকে দেওয়া সম্মাননা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো।
(ফাইল ছবি)

দাবিকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে অনলাইনে একটি ওয়য়েব সাইট পাওয় গিয়েছে। সাধারণত বিশ্বের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের ডোমেইন ডটএডু (.edu) দিয়ে শেষ হলেও এর নামের শেষে রয়েছে ডটওআরজি (.org) যা কেবল বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।

ডোমেইন যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান হুডটইজ (who.is) এ দেখা গেছে, ghpuedu.org এই ডোমেইনটির নিবন্ধন করা হয়েছে ২০১৯ সালের তিন সেপ্টেম্বর। এই বছরের তিন সেপ্টেম্বর সাইটটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। সাধারণত প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডোমেইনের নিবন্ধন অনেক বছরের জন্য করা হয়। সেই তুলনায় এই ডোমেইনটি নতুন এবং মাত্র একবছরের জন্য নিবন্ধন করা হয়েছে

গ্লোবাল হিউম্যান পিস ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইট ঘেটে এর স্থায়ী ক্যাম্পাসের কোনো ঠিকানা পাওয়া যায়নি। তবে তাদের কিছু আঞ্চলিক কেন্দ্রের ঠিকানা দেওয়া আছে। এই ঠিকানাগুলো গুগল ম্যাপে খোঁজে করে এই সম্পর্কিত কোনো কিছু পা্ওয়া যায়নি। অর্থাৎ ঠিকানাগুলো ভূয়া। এছাড়া ইতালি, সৌদিআরব ও জার্মানিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির আঞ্চলিক অফিস থাকার কথা উল্লেখ করলে ওয়েবসাইটে কোনো লিংক কিংবা ঠিকানা দেয়া হয়নি।

গ্লোবাল হিউম্যান পিস ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইট ঘেটে দেখা যাচ্ছে, এখান থেকে কোনো আন্ডারগ্রাজুয়েট ও গ্রাজুয়েট ডিগ্রি দেওয়া হয় না। শুধু কিছু অনলাইনভিত্তিক কোর্সের লিংক দেয়া আছে। এছাড়া সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রি দেয়া হয় অনেকগুলো বিষয়ে। বিশ্বে এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নাই যেখানে আন্ডারগ্রাজুয়েট ও গ্রাজুয়েট ডিগ্রি না দিয়ে শুধু সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়া হয়।

গ্লোবাল হিউম্যান পিস ইউনিভার্সিটি’র ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সম্মানসূচক পিএইচডি’র প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী পেইজে বলা হয়েছে, “To raise funds for charity and to cover research development expenses the details of which may be given in the university website.” অর্থাৎ চ্যারিটি কিংবা গবেষণা উন্নয়ন ব্যয়ের ফান্ড যোগাড় করার জন্য তারা সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করে।

সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কোনো প্রসেসিং ফি নেয় কিনা এর উত্তরে তারা লিখেছে, “Yes, this the university collects to cover the expenses of a public function and a wide press coverage for the awardees if it is conducted.” অর্থাৎ তারা অনুষ্ঠান এবং মিডিয়া কাভারেজের জন্য সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রি যাদেরকে দেয়া হয় তাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে থাকে। এছাড়া প্রশাসনিক ব্যয়, উদযাপন ব্যয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বিভাগকে তহবিল সরবরাহের জন্য ফি প্রদান করতে হয়। সহজ কথায় টাকার বিনিময়ে সম্মানসূচক ভূয়া ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়ে থাকে এটি।

গ্লোবাল হিউম্যান পিস ইউনিভার্সিটি ভারতের আইন অনুযায়ী অবৈধ প্রতিষ্ঠান। এমনটি ভারতে এই নামে কোনো বৈধ বিশ্ববিদ্যালয় নাই। এটি টাকার বিনিময়ে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে থাকে।

 

এদিকে ভারতের বেশ কিছু সংবাদ মাধ্যমে গত বছরের সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক গ্লোবাল পিস বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থের বিনিময়ে ডক্টরেট ডিগ্রি বিক্রয় করা হয়। ২৬ সেপ্টেম্বর এমন একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে স্থানীয় পুলিশ। সেখান থেকে দু’জনকে পুলিশ হেফাজতেও নেওয়া হয়েছিল।

তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিগুলি অর্থের জন্য লোকদের কাছে বিক্রি করা হয়। স্থানীয় একটি হোটেলে ভারতের জাতীয় মানবাধিকার শান্তি কাউন্সিল এবং আন্তর্জাতিক গ্লোবাল পিস বিশ্ববিদ্যালয় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। হরিহার বিধায়ক রামাপ্পা এই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন।

অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, বিধায়কও এই ডিগ্রির প্রার্থী ছিলেন। রাজ্য জুড়ে এবং তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে মোট ১৪২ জন প্রার্থী এই ডিগ্রি অর্জনের জন্য জড়ো হয়েছিল। বেশিরভাগ প্রার্থী ডিগ্রির জন্য ২০,০০০ টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ প্রদান করেছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির বিষয়ে মমতাজ বেগম কিছু জানেন কি না তা জানতে উনার ব্যক্তিগত ফোন নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় বার্তা বাজার

ভারতের সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর গুলো দেখতে ক্লিক করুন- – সিটিটুডে.নিউজ ,  ডেকান হেরার্ল্ড,  টিভি নাইনের ভিডিও।

 

বার্তা বাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর