সালথায় তাণ্ডব: পুলিশি অভিযানে পুরুষ শূন্য প্রায় অর্ধশত গ্রাম

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বিভিন্ন সরকারি অফিস ও থানায় নজিরবিহীন তাণ্ডবের ঘটনার পর পুলিশি অভিযানের কারণে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে।

শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে ওই সব এলাকার বাড়ি-ঘর গুলোতে নারী আর শিশু ছাড়া কোন পুরুষ সদস্য দেখতে পাওয়া যায়নি। গ্রেফতার আতঙ্কে পুরুষ শূণ্য হয়ে পড়েছে বিভিন্ন গ্রাম। বিশেষ করে উপজেলা সদরে অবস্থিত রামকান্তপুর ইউনিয়ন, সোনাপুর ইউনিয়ন, গট্রি ও ভাওয়াল ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশত গ্রাম পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে।

ফুকরা বাজারেই ঘটনার প্রথম সূত্রপাত। ছবি- বার্তা বাজার

সূত্র জানায়, সালথা উপজেলায় ১৬৫টি কওমী মাদ্রাসা রয়েছে। যা এ জেলার মধ্যে সবচাইতে বেশী। হেফাজতে ইসলামের জেলা শাখার আমীর ও সেক্রেটারীর বাড়ি এই সালথাতে। ওই রাতে হেফাজতে ইসলামের আমীর ও বাহিরদিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আকরাম আলীকে গ্রেফতারের গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা উস্কে দেয়া হয়েছে। এখন এসব এলাকার আলেম ও মাদ্রাসা ছাত্রদের মাঝেও উদ্বেগ-উৎকন্ঠা কাজ করছে।

স্থানীয়রা জানান, অবস্থা এমনই দাড়িয়েছে বাহিরদিয়া মাদ্রাসার প্রবীণ শিক্ষক শতবর্ষী মাওলানা সুলাইমান নদভীও এখন বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন।

রামকান্তপুর ইউনিয়নের শৌলডুবি গ্রামের মো. ইউনুস শেখের স্ত্রী মালেকা বেগম (৫২) বলেন, আমার স্বামী গ্রামে ক্ষেতে কাজ করেন। তিনিও বাড়িতে থাকার সাহস পাননা। যুবক ছেলেকে আগেই বাইরে আত্মীয় বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

পুরুষ শূন্য বাড়ির চিত্র। ছবি- বার্তা বাজার

সোনাপুর ইউনিয়নের ফুকরা গ্রামের এক কলেজ ছাত্র বলেন, ঘটনার পর তিনি ফরিদপুর শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছেন। ঘটনার সাথে জড়িত না হলেও অভিভাবকেরা তাঁকে গ্রামে রাখার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।

ফুকরা বাজার এলাকার করিমন বেগম জানান, সব সময় ভয়ে রয়েছি। পুলিশ দেখতে দেখতে সারাদিন কেটে যাচ্ছে। বাড়িতে কোন পুরুষ সদস্য নেই। সবাই পালিয়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।

নূরজাহান নামে একজন জানান, ওই দিন অন্য এলাকা থেকে লোকজন এসে হামলা করছে। আমাদের গ্রামের কোন লোক ছিলো না। তিনি বলেন শুনেছি ফুকরা বাজারে এসিল্যান্ডের সাথে থাকা সদস্যদের সাথে বাজারের লোকজনের গুন্ডগোলকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটেছে।

গট্রি এলাকার মনির নামে একজন জানান, বালিয়া গট্রি এলাকা ও উপজেলা কেন্দ্রীক এলাকার বাড়ি গুলোতে কোন পুরুষ সদস্য নেই। ঘটনার পর থেকে ওই সব এলাকার লোকজন পলাতক অবস্থায় রয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে তিনি আশা করেন কোন নিরীহ লোক যেন হয়রানীর স্বীকার না হন।

তান্ডবের ঘটনার পর থেকে এ পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৫টি। এই সব মামলায় আসামী করা হয়েছে ২৬১ জনের নাম উল্লেখ সহ অজ্ঞাত ৩/৪ হাজার জনকে। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত আটক করা হয়েছে মোট ৫১জনকে। এ মামলায় রিমান্ডে রয়েছে ২৬জন।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের ফুকরা বাজারে লকডাউনের কার্যকারিতা পরিদর্শনে যান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মারুফা সুলতানা খান হিরামণি। এ সময় সহকারী কমিশনারের উপস্থিতিতে মানুষ ছুটাছুটি করে। পরে স্থানীয়রা জড়ো হয়। মানুষের ভীড় দেখে এসিল্যান্ড ফুকরা বাজার থেকে চলে আসেন। পরে হেফাজতের জনৈক এক আলেমকে গ্রেফতার করা হয়েছে, এমন গুজব ছড়িয়ে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১ পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ উপজেলা চত্বরে দেশীয় অস্ত্র ঢাল-কাতরা ও লাঠিসোটা নিয়ে প্রবেশ করে বিভিন্ন সরকারি দফতর ও থানায় এই তান্ডব চালায়। মধ্যযুগীয় কায়দায় হামলাকারিরা তিন ঘন্টাব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তাদের এই হামলায় রক্ষা পায়নি উপজেলা পরিষদ চত্বরের গাছপালা ও বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল। এতে সালথা উপজেলা সদর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তান্ডবচলাকালে ইউএনও-এসিল্যান্ডের দুটি সরকারি গাড়ি সম্পর্ণ পুড়িয়ে দেয় তারা। এছাড়াও সাংবাদিকের একটি মোটর সাইকেলসহ তিনটি মোটর সাইকেল ভাঙচুর করা হয় ও দুটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৫৮৮ রাউন্ড শট গানের গুলি, ৩২ রাউন্ড গ্যাস গান, ২২ টি সাউন্ড গ্রেনেড এবং ৭৫ রাউন্ড রাইফেলের গুলি ছুড়ে। এসময় পুলিশ ও র‌্যাবের ৮জন সদস্য আহত হয়।

মিয়া রাকিবুল/বার্তাবাজার/ভি.এস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর