গ্রামীন সড়কটি সংস্কার না হওয়ায় চরম দুর্ভোগে কয়েক লাখ মানুষ
ছয়দফা বন্যার পর জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট জরুরি মেরামত ও সংস্কার হলেও গ্রামীণ জনপদের সড়ক এখনো সংস্কার হয়নি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও চলাচলের অনুপযোগী, খানাখন্দে ভরা রাস্তা দিয়ে ভারী যানবাহনসহ পথচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন।
আর্থসামাজিক অবকাঠামো ও জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট, ব্রীজ কালভার্ট সংস্কারের জন্য সরকার নিয়মিত প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিচ্ছে। সময়মতো টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। উদ্বোধনের পরই শুরু হয় মন্থরগতি। নানান অজুহাতে ঠিকাদাররা বারবার সময় বাড়িয়ে নিয়ে নির্ধারিত তারিখ পেরোলেও বছরের পর বছর কাজ অসমাপ্তই থেকে যাচ্ছে। ফলে বেড়েই চলেছে জন দূর্ভোগ। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট সময়মতো সংস্কার না হওয়ায় সরকার বিমুখ হচ্ছে সাধারণ জনগণ।
সুষ্ঠু তদারকি ও ঠিকাদার দের খামখেয়ালিপনার কারণে গ্রামীণ জনপদের রাস্তাঘাট নির্মাণে মন্থরগতি চলছে। ফলে সরকারের নেয়া প্রকল্প সঠিকভাবে নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যাতায়াতের আগের রাস্তা গর্ত খুঁড়ে, খাল করে চলাচলের অযোগ্য করে তুলেছে। সঠিক সময়ে রাস্তা সংস্কারের দাবীতে সংশ্লিষ্ট বিভাগে বার-বার তাগাদা দিয়েও লাভ হচ্ছে না।বাধ্য হয়ে চলাচলের অনুপযোগী এলাকার মানুষ রাস্তা অবরোধ, বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করছে। গ্রামীণ সড়ক সংস্কারের দাবীতে কুড়িগ্রামের মানুষ আন্দোলন করলেও সফলতা পাচ্ছে না।
গত রবিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় – কুড়িগ্রাম সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় উলিপুর বজরা চিলমারী রোড। দুই উপজেলার প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষের যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কারের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে ঠিকাদার কাজ শুরু করেন ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে। দরপত্র অনুয়ায়ী ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বরে কাজ শেষ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় “মেসার্স মোজাহার এন্টারপ্রাইজ ‘নামে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যার টেন্ডার আইডি নং ২২৬২১৩, প্রাক্কলিত মূল্য ৩৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ২০১৯ সালের মধ্যে কাজ শেষ করবে মর্মে সড়ক বিভাগের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলেও এখনো কাজ শেষ করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টারপ্রাইজ। নির্ধারিত সময়ের ১৫ মাস অতিবাহিত হলেও কাজ শেষ না করার কারণ জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কেউই মুখ খোলেননি। মোজাহার এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারীর মোবাইলে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা প্রেরন করলেও তিনি এই প্রতিনিধির সাথে কথা বলেননি।
কুড়িগ্রাম-চিলমারী রোড, একই নামে নেয়া আরও একটি কাজ, যার আইডি নং ৭৫৬২১,কাজ শুরুর তারিখ ২০ ফেব্রুয়ারী ‘২০ ইং এবং কাজ সম্পন্ন করার তারিখ ১৯ নভেম্বর’২০ ইং নির্ধারণ করা হলেও অদ্যাবধি ওই কাজের ১০ শতাংশ সম্পন্ন হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই রাস্তায় কর্মরত একজন শ্রমিক জানান,মোজাহার এন্টারপ্রাইজ সারাদেশে কাজ নেয় এবং উদ্বোধনের পরপরই ওই কাজ বন্ধ রেখে অন্য জেলায় কাজ শুরু করে তাহলে ক্যামনে ঠিক সময়ে কাজ শেষ হবে? এই প্রতিষ্ঠানের কোন নিয়মনীতির বালাই নাই। তারা তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করে। চলাচলের জন্য এই রাস্তা দীর্ঘ দিনেও সংস্কার না করে উল্টো খানাখন্দ গর্ত খুঁড়ে মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে রাস্তাটি।
চিলমারী উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ শওকত আলী বীরবিক্রম বলেন, সড়ক বিভাগকে বারবার বলা হলেও এই টালবাহানা চলছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কার না হওয়ায় কয়েক লাখ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। এই ঠিকাদারের কারণে জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার বেহাল অবস্থা। মোজাহার এন্টারপ্রাইজ এর প্রাপ্ত সকল কাজেই এরকম দীর্ঘসূত্রতা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও নানা অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছে। মোজাহার এন্টারপ্রাইজের এহেন অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াতো দুরের কথা,উল্টো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সাফাই গায় সড়ক বিভাগ।কাজ দেখাশুনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীরা ঐ ঠিকাদারের ভয়ে তটস্থ।
জনৈক প্রকৌশলী জানান- কাজের অনিয়মের অভিযোগ করলেই শুরু হয় হেনস্তা, এমনকি করা হয় শাস্তিমূলক বদলি।সড়ক ও জনপদ বিভাগের রাঘব -বোয়াল হিসেবে পরিচিত মোজাহার এন্টারপ্রাইজের কারণে যাতায়াতে দূর্ভোগের শিকার কুড়িগ্রামের সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ। সরকারী কাজে নয়-ছয় করেও সঠিক সময়ে কাজ শেষ না করে জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টিকারী ঠিকাদার মোজাহার এন্টারপ্রাইজ জনবান্ধব এই সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ব্যাহত করছে। দাপটে অনিয়ম, দুর্নীতি করেও বহাল তবিয়তে একের পর এক শতকোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন কিভাবে? তার খুঁটির জোর কোথায়, জানতে চায় জেলা বাসী।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এ বিষয়ে জানতে চাইলে, কুড়িগ্রাম সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন,”আমার জানামতে ঐ রাস্তার কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। কাজে অনিয়ম হলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
সুজন মোহন্ত/বার্তাবাজার/পি