আজ যশোর ক্যাথলিক চার্চ গণহত্যা দিবস

রক্তমাখা ১৯৭১ সালের ৪ঠা এপ্রিল যশোরের পুরানো পুলিশ সুপারের কার্যলয়ের পাশে অবস্থিত যশোর ক্যাথলিক চার্চের ভেতর ঢুকে পাক হানাদাররা একে একে গুলি করে নির্বিচারে হত্যা করে ফাদার মারিও ভেরোনেসিসহ আরো ৬ জনকে।

শহীদ মারিও ভেরোনিস ফাদারের অপরাধ ছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিতেন।

প্রতি বছর ৪ঠা এপ্রিল যশোরের ক্যাথলিক চার্চে তাঁর জন্য বিশেষ প্রার্থনা উপাসনা অনুষ্ঠান করা হয়।

শহীদ ফাদার মারিও ভেরোনেসির সঙ্গে আরো যাঁরা হানাদার বাহিনীর অস্ত্রের আঘাতের শিকার হয়ে প্রান হারিয়েছিলেন তাঁরা হলেন, স্বপন বিশ্বাস, অনিল সরদার, প্রকাশ বিশ্বাস, পবিত্র বিশ্বাস, ফুলকুমারী তরফদার ও ম্যাগদালেনা তরফদার।

মুক্তিযুদ্ধের ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর যশোরবাসী বুঝে যায় আর পাকিস্তানের সঙ্গে এক সঙ্গে থাকা নয়, যুদ্ধ অনিবার্য। এরপর মার্চের শেষ দিকে প্রতিদিনই শহরের কোন না কোন এলাকার মানুষ পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে আহত এবং নিহত হতে থাকে। আর তারা চিকিৎসার জন্য যেতেন যশোর সদর হাসপাতাল নয়, ফাতিমা হাসপাতালে। ওই হাসপাতালের তখন ছিল ব্যাপক নাম ডাক। আর এই সব আহতদের চিকিৎসা করতেন ইতালির অধিবাসী ফাদার মারিও ভেরোনেসি।

বিষয়টি জেনে যায় যশোর সেনানিবাসে অবস্থানরত পাকিস্তানী কর্মকর্তারা। তারা চার্চ এবং হাসপাতাল আক্রমণের পরিকল্পনা করে।

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল বিকেলে হানাদার বাহিনী অস্ত্র হাতে মারার উদ্দেশ্যে ঢুকে পড়ে যশোর ক্যাথলিক চার্চের মধ্যে। সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন যশোরের নিহত অনিল সরদারের পুত্র পরেশ সরদার

পরেশ সরদার তার সচক্ষে দেখা ঘটনার বর্ননায় বলেন, তাদের আসা দেখে আমার বাবা আমাকে একটি ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখে। কয়েক পাক সেনা এসে আমার বাবাদের কি যেন বলে। এরপর দেখি ফাদার মারিও দুই হাত উঁচু করে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন। এমন সময় তারা গুলি করে ফাদারকে। ফাদার মাটিতে পড়ে যান। এরপর স্বপন বিশ্বাসও হাত উঁচু করে। তাকেও গুলি করা হয়। পরে আমরা ঘর থেকে বের হয়ে আশ্রয় নিই চার্চের মধ্যে পুকুর পাড়ের কলাবাগানের ঝোপের ভেতর। এরপর তারা পর্যায় ক্রমে হত্যা করে বাকিদের।

পরদিন ৫ এপ্রিল ফাতিমা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ফাদার মারিওকে এবং বাকি ছয়জনকে চার্চের ভেতর গর্ত করে গনকবর দেওয়া হয়। সে সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন লরেন্স পান্ডে। তিনি বলেন, ঘটনার সময় ফাতিমা হাসপাতালের ওপর রেডক্রসের পতাকা উড়ছিল। কর্মচারীরা রেডক্রসের ব্যাজ পরা ছিলো। তবুও তারা এটা দেখাট পরও গির্জায় নির্মম হামলা চালায়। হত্যাকান্ডের পর যশোর সেনানিবাসের কর্মকর্তা তোফায়েল, যশোরের ডিসিসহ চার্চে এসে হত্যাকান্ডে ইপিআররা ঘটিয়েছে বলে প্রতিবেদন দিতে বলে। কিন্তু দায়িত্বরত ডাক্তার ফাদার আন্তন ও ফাদার ফ্রান্সিস আর্মি অফিসারকে জানান, পাকিস্তানী হানাদাররাই এ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। পরে আর্মি হেডকোয়ার্টার্সে প্রতিবেদন পাঠানো হয় এ হত্যাকান্ডে পাকিস্তানী সেনারাই ঘটিয়েছে বলে।

নির্মম হত্যার শিকার ওই ৬ শহীদের কবর ক্যাথলিক চার্চ কর্তৃপক্ষ এখনো যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করছে। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেলো এই খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের যাজকদের এই নির্মম গণহত্যার ৫০ টি বছর।

এ্যান্টনি দাস/বার্তাবাজার/ভি.এস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর