ভিক্ষাবৃত্তিকে ঘৃণা করেন বৃদ্ধ বাদাম বিক্রেতা আছের উদ্দিন

বাদাম বিক্রি না করলি সংসার চলবি ক্যাংকা করি! ছোল্-পোলেরা বিয়ে-সাদী করি সবাই ভিনো ভিনো। মোর নিজস্ব ১ শতক জমিও নাই, সরকারী বন বাগানের ভিতর এ্যাকনা ছাপড়া ঘর করি হামরা বুড়া-বুড়ি কোনমতে খায়া না খায়া দিন কাটাওছি বাবা! এই বুড়া বয়সেও পেটের দায়ে প্রত্যেকদিন পায়ে হেঁটে গ্রামে গ্রামে বাদাম বিক্রি করা নাগে। শরীলট্যা আর চলে না বাবা! মুঁই এ্যালা আর ভালো চোখেও দেখোনা, বেশী হাঁটপেরও পারোনা। কিন্তু- পেটে যে খায়!

অশ্রুসিক্ত চোখ আর আকুতি ভরা কন্ঠে কথাগুলো বলছিলেন, পীরগঞ্জের চৈত্রকোল ইউনিয়নের খাসতালুক গ্রামের বাদাম বিক্রেতা আছের উদ্দিন কাজী। বয়স ৭৫ বছর। তার বাবার নাম মৃত খরমুদ্দিন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ অসহায় আছের উদ্দিন প্রায় ৫০ বছর ধরে পায়ে হেঁটে গ্রামে গ্রামে ও স্থানীয় কলোনী বাজারে বাদাম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রতিদিন সকালে স্ত্রী বেলী বেগমের সহায়তায় কাঁধে ভার সাজিয়ে বাদাম নিয়ে গ্রামে বের হন। বিকালে বাড়ী সংলগ্ন কলোনী বাজারে বাদাম বিক্রি করে সন্ধ্যার পূর্বে বাড়িতে ফিরেন।

এ থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলে। কিন্তু কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা শারীরিক অসুস্থ্যতার কারণে বাদাম বিক্রি করতে না পারলে প্রায় উপোস থাকতে হয়। ভূমিহীন আছের উদ্দিন সরকারী সাহায্য-সহযোগীতা হিসেবে শুধু বয়স্ক ভাতা পান। যা চাহিদার তুলনায় অতি নগন্য। ভিক্ষাবৃত্তির কথা তুলতেই অনেকটা ক্ষিপ্ততার স্বরে আছের উদ্দিন বলেন, ভিক্ষাবৃত্তি ইসলাম ধর্মে জায়েজ নেই। আল্লাহতায়ালার কাছে এটা নিকৃষ্ট কাজ। যারা ভিক্ষা করে তারা অসম্মানজনক, অবহেলিত ও তুচ্ছ জীবনযাপনকারী। যত দিন বেঁচে আছি কর্ম করেই বাঁচতে চাই। ভিক্ষার প্রতি ঘৃণাই যেন বৃদ্ধ আছের উদ্দিনকে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগাচ্ছে।

মঙ্গলবার সকালে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হলে আছের উদ্দিন জানান, তার ৫ ছেলে ১ মেয়ে। বড় ছেলে হারুন রশিদ একই ইউনিয়নের চৈত্রকোল গ্রামে বিয়ে করে ঘরজামাই থাকে। বর্তমান সে প্যারালাইজড হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। ২য় ছেলে সাদেকুল ইসলাম উপজেলার মাগুরা গ্রামে, ৩য় ছেলে রফিকুল ইসলাম হাসারপাড়া গ্রামে ও ৪র্থ ছেলে রিপন মিয়া গ্রামেই বিয়ে করে ঘরজামাই রয়েছে। ছোট ছেলে মাসুদ মিয়া সম্প্রতি বিয়ে করে এখন পর্যন্ত সংসারেই রয়েছে। সে আমার সাথে সরকারী বন বাগানের ঐ খুপড়ী ঘরেই বসবাস করছে। তারা পেশায় প্রত্যেকেই রিক্সা ও ভ্যান চালক। মেয়ে সাবানা বেগমের বিয়ে দিয়েছি অনেক দুরে। সে ইচ্ছা করলেও আমাদের দেখ-ভাল করতে পারেনা।

বর্তমান স্ত্রী বেলী বেগমের শারিরীক অবস্থাও তেমন ভাল না। জীবনের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করতেই আছের উদ্দিন দীর্ঘশ্বাসে বলেন, বাবারে! জীবনের শেষ সময়ে দু’বেলা দু’মোঠো ভাত আর লজ্জা নিবারণের জন্য বস্ত্র ছাড়া কিছুই চাইনা।

বার্তাবাজার/পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর