সময়ের বিবর্তনে চারঘাটে মরছে নদী, কমছে মাঝি!
নদী-নালাবেষ্টিত বাংলাদেশে এক সময়ে যোগাযোগের অন্যতম বাহন ছিল নৌকা। সেই নৌকা চালিয়ে যারা জীবনধারণ করেন অঞ্চলভেদে তারা মাঝি, মাল্লা, নাওয়া, নৌকাজীবী, নৌকাচালক, কান্ডারি, পাটনি, কর্ণক ইত্যাদি নামে পরিচিত।
তবে সময়ের ব্যবধানে সেই নদী আজ হারাতে বসেছে, এক কালের খরস্রোতা নদ বড়াল শুকিয়ে তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। নদটি নাব্যতা হারিয়ে এখন ফসলের মাঠে পরিনত হয়েছে। নদের বুকে ধান, গম, মশুরসহ বিভিন্ন ফসলের জন্য হালচাষ করা হচ্ছে। উজানে বাঁধ দিয়ে চাষাবাদের জন্য সেচ দেয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং যাতায়াতের জন্য নদের বুকে একাধিক ব্রীজ নির্মাণ করে নদের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
তাছাড়া প্রমত্ত পদ্মায় পানি প্রবাহ স্বাভাবিক না থাকায় পদ্মার শাখা বড়াল নদের এ অবস্থা হয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। নদের বুকে পলি জমে জমে উঁচু হয়েছে, দু’পাড় চেপে গেছে এবং নদের পাড়ে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরী করা হয়েছে। নদের চর ভূমিদস্যুরা দখল করে নিয়েছে।

রাজশাহী জেলার চারঘাট নামক স্থান থেকে পদ্মার শাখা হিসেবে বড়াল নদের উৎপত্তি হয়ে বাঘা, বাগাতিপাড়া, বড়াইগ্রাম, চাটমোহর, ভাংগুড়া ও ফরিদপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে বাঘাবাড়ী হয়ে হুড়া সাগরের বুকে মিশে নাকালিয়ায় যমুনা নদীতে পড়েছে। শুধু বাগাতিপাড়া উপজেলার বুক চিরে প্রায় ২২ কিঃ মিঃ পথ অতিক্রম করেছে। এক সময় যোগাযোগের সুবিধার কারনে বড়াল নদের দুই পাড়ে জামনগর বাজার, তমালতলা বাজার, বাগাতিপাড়া থানা ভবন, দয়ারামপুর সেনানিবাসসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
এছাড়া অসংখ্য জেলে পল্লী জীবিকার প্রয়োজনে গড়ে উঠেছে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯৮১-৮২ অর্থ বছরে নদের তীরবর্তী উপজেলাগুলোকে বন্যামুক্ত করার জন্য উৎসমুখ চারঘাটে বাঁধ নির্মানের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক গতি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে স্লুইসগেট ও বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে স্লুইসগেট ও বাঁধ নির্মাণের ফলে ক্রমান্বয়ে বড়াল নদ শুকিয়ে শীর্ণ খালে পরিনত হয়েছে। বর্ষায় নদে কিছু পানি জমলেও শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই শুকিয়ে মরা নদে পরিনত হয়। এ সুযোগে এ সময়ে এলাকার কৃষকরা নদের বুক জুড়ে ফসলের আবাদ করেন।
পরিনত হয় গবাদী পশুর চারণ ক্ষেত্রে। এক সময় যে বড়ালের পানির সেচে নদের তীরবর্তী মানুষ তাদের জমিতে ফসল ফলাত এখন সে নদের বুকে অগভীর নলকূপ বসিয়ে চলে ইরি চাষ। নদ আছে, নৌকা আছে, নেই শুধু পানি। নদে পানি না থাকায় এ নদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্রগুলো তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। প্রতিদিনের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করায় পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। এখনই সরকারী উদ্যোগ গ্রহন করে পুনঃ খনন করা না হলে বড়াল তার ঐতিহ্য হারাবে, মুছে যেতে পারে মানচিত্র থেকে এমনই অভিমত সংশ্লিষ্টদের।
এ ব্যাপারে চারঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিয়তি রাণী কৈরি বললে, আমাদেরকে নিয়ে ডিসি অফিসে একটি মিটিং হয়েছিল নদীগুলো আরেকবার জরিপ করা বিষয়ে, জরিপ করার পরে নদীর যে প্রকৃত সীমা আছে তা নির্ধারন করা যাবে এবং তারপরই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করব। তবে জরিপের কার্যক্রম আটকে থাকার কারণে সকল সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে আমি ও ইউএনও স্যার দুজনেই নতুন করে যেন কোনো স্থাপনা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখছি। কিছুদিন আগেও পৌরসভা কর্তৃক টয়লেট নির্মাণের কাজ টি বন্ধ করা হয়েছে এবং কেউ যেন নতুন করে কোনো স্থাপনা তৈরি করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
কিন্তু প্রকৃত জেলেদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে কোন সাহায্য সহযোগিতার বিষয়ে ভাবা হয়েছে কিনা জানতে চেয়েছিলাম উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ মোল্লার কাছে তিনি বলেন, আমরা উপজেলা মোট ২৫ জন জেলেকে বিকল্প আয়র বান্ধব কর্মসূচি প্রকল্পের আওতায় এনে স্বাবলম্বী করতে ভ্যান, রিক্সা, সেলাই মেশিন, ছাগলসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করব। তবে পুরো উপজেলাজুড়ে ২৫ জন যথেষ্ট কিনা জানতে চেয়েছিলাম কিন্তু এ বিষয়ে তাদের কিছু বলার নেই বলে জানান এই কর্মকর্তা।
চারঘাট বড়াল নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বাদশা বলেন, কর্তৃপক্ষ যদি খননের মাধ্যমে বড়াল নদের প্রাণ ফেরানোর চেষ্টা করে তবে শুধু অর্থের অপচয় হবে কোন কাজ হবেনা । নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ সচল করতে হবে এবং এর জন্য চারঘাট রামাগাড়ি সহ সমস্ত স্লুইস গেট ও বাঁধ অপসারণ করতে হবে। তবেই আমরা আবার ফিরে পেতে পারি আমাদের বড়াল নদ।
এতো সব প্রতিশ্রুতির মধ্যেও আশার আলো দেখছেন না উপজেলার পদ্মা-বড়াল তীরবর্তী জেলেরা। তাদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, শুধু ইলিশ আহরণের সময় খোঁজ খবর নিলেও সারাবছর নেওয়া হয়না খোঁজ, দেওয়া হয়না সাহায্য, করা হয়না সহযোগিতা। সব মিলিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি আমরা।
বার্তাবাজার/পি