১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার-পরিজনসহ নৃশংস হত্যাকান্ডের পর সেনাশাসক জিয়াউর রহমান নিষিদ্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করায় আজ গোটা জাতি খেসারত দিচ্ছে। দিনে দিনে দেনা বাড়তে বাড়তে এখন এমন উগ্রমূর্তি ধারণ করেছে যেন মনে হয় লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশ আজ উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির ঔদ্ধত্য ও ত্রাসের অভয়ারণ্য।
বিএনপি তো হেফাজতের শাপলা চত্বরের ভয়াবহ তান্ডবে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিলই। রাজনৈতিক সম্পর্ক আছেই।
আওয়ামী লীগের অনেক মাঠ নেতা-কর্মী আদর্শহীন বোধহীন রাজনীতির কারণে এদের সঙ্গে বুক মিলিয়ে মঞ্চে ওঠেন। বঙ্গবন্ধুর লেখা বই ছড়িয়ে দিতে পারলেও এক যুগে আওয়ামী লীগ তার নেতা-কর্মীদের চিন্তা-চেতনা-কর্মে মহান নেতার আদর্শ-নীতি-নৈতিকতায় তৈরি করতে পারেনি। তাই কেউ জামায়াত প্রডাক্ট আজহারীর ওয়াজে যায়, কেউ যায় উগ্র মামুনুল হকের সঙ্গে।
আর এরা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। এরা যখন তখন সাম্প্রদায়িকতার হিংসা-বিদ্বেষের বিষাক্ত উন্মাদনা ছড়ায়। যখন তখন সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে নানা অজুহাতে হামলা-ভাঙচুর করে জাতির জন্য কলঙ্ক বয়ে আনে। প্রশাসন ও আইন এদের কখনো কঠোরভাবে দমন করে না। এবার শাপলা চত্বরের এ উগ্রশক্তি ভাটির জনপদ প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি হাওর-বাঁওড় নদী আর মরমি সাধক কবি ও বাউলের তীর্থভূমি জল-জোছনার সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংখ্যালঘু হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছে।
শাল্লা সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা। প্রগতিশীল রাজনীতির তীর্থভূমি। মরহুম আবদুস সামাদ আজাদ, প্রয়াত অক্ষয় কুমার দাস, কমরেড বরুণ রায় ও পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের রাজনীতির স্মৃতিময় জায়গা। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বারবার দিরাই-শাল্লা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। হাড্ডাডাড্ডি লড়াইয়েও শাল্লার ভোটই তাঁকে বিজয়ী করেছে। সুনামগঞ্জের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যের ওপরই আঘাত নয়, নিরীহ গরিব হিন্দুদের ঘরবাড়ি আক্রমণ করে আতঙ্কিত করা হচ্ছে।
এ দেশ সব ধর্মের মানুষের রক্তে অর্জিত। এখানে সবার সম-অধিকার। কিন্তু একাত্তরের পরাজিত শক্তির আদর্শের উত্তরাধিকাররাই বারবার এমন জঘন্য বর্বর ঘটনা বিভিন্ন এলাকায় ঘটায়। মামুনুল হকদের উগ্রতার বিরুদ্ধে আজ বাংলাদেশকে রুখে দাঁড়ানোর সময়। এরা ইসলামের শান্তির বাণী নয়, হিংসা-বিদ্বেষভরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বয়ান করে জেহাদি সুরে। এটা আলেম-ওলামার সুর নয়। প্রশাসন এসব দেখেও দেখে না কেন জানি না। ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার সৌন্দর্য যেমন উগ্র হিন্দুত্ববাদ ধূসর করেছে তেমনি এ দেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ধর্মনিরপেক্ষতাসহ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সংবিধান থেকে মুছে দেশকে আজ মডারেট মুসলিম কান্ট্রির তকমা দিয়েছে।
একটি দেশে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ যখন তার সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে নিরাপদে বাস করতে পারে না তখন সে রাষ্ট্র চরিত্র হারায়। রূপ হারায়। শাল্লায় হামলাকারীদের আটক করা হয়েছে। কঠোর শাস্তি চাই। তার আগে উগ্রপন্থিদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া চাই। ধর্মের নামে, সমাজবিপ্লবের নামে এ দেশে উগ্রপন্থিরা অভিশাপ এনেছে। উগ্রতার স্থান জনগণ দেয়নি ভোটে, প্রশাসন দিতে পারে না।-বাংলাদেশ প্রতিদিন। (সংক্ষেপিত)।
লেখক-পীর হাবিবুর রহমান; নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
বার্তাবাজার/এসজে