‘কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনম-ভর, আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর’। আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে লালিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ আধুনিক কবি, পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের ৪৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
পল্লীকবি ১৯০৩ সালের ১ লা জানুয়ারি ফরিদপুর সদর উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়নের তাম্বুলখানা গ্রামে মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পল্লীকবির পুরো নাম মোহাম্মাদ জসীম উদ্দীন মোল্যা। বাংলা সাহিত্যে তিনি পল্লী কবি হিসেবে পরিচিত।
রবীন্দ্র যুগের কবি হয়েও রবীন্দ্র প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে পল্লী জীবনকে অবলম্বন করে জসীম উদ্দীন নির্মাণ করেছেন স্বকীয় এক কাব্যভুবন। তার সাধনায় খুলে গেছে বাংলা কবিতার নতুন এক দুয়ার। তার লেখা ‘কবর’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে এক অবিস্মরণীয় অবদান। নকশী কাঁথার মাঠ ও সোজন বাদিয়ার ঘাট কবির শ্রেষ্ঠ দুটি রচনা। এ দুটি রচনা পৃথিবীর বহু ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।
তিনি ১৯২১ সালে ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এর পর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৯ সালে বিএ এবং ১৯৩১ সালে এমএ শেষ করেন। পাঠ চুকিয়ে কবি ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. দীনেশচন্দ্র সেনের অধীনে রামতনু লাহিড়ী গবেষণা সহকারী পদে যোগ দেন। এর পর ১৯৩৮ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
তিনি ১৯৪৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেন এবং তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগে যোগ দেন। ডেপুটি ডিরেক্টর পদে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এখানেই কর্মরত ছিলেন তিনি।
পল্লীকবি জসীম উদদীন শুধু একজন কবিই নন, তিনি একজন গীতিকার এবং একজন গান সংগ্রাহকও। জসীম উদ্দীন ১০ হাজারেরও বেশি লোকসংগীত সংগ্রহ করেন। তার সংকলিত এসব লোকসংগীতের বিশাল একটি অংশ জারিগান ও মুর্শিদা গানে স্থান পেয়েছে।
জসীম উদ্দীন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী অনেক গান রচনা করেছেন। বিখ্যাত লোকসংগীতের গায়ক আব্বাস উদ্দীন, তার সহযোগিতায় কিছু বিশেষত ভাটিয়ালি ধারার অবিস্মরণীয় লোকগীতি নির্মাণ করেছেন।
জসীম উদ্দীন রেডিওর জন্যও আধুনিক গান লিখেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন তিনি বহু দেশাত্মবোধক গান লিখেন। আমার হার কালা করলাম রে, নদীর কুল নাই কিনার নাই, আমায় ভাসাইলিরে ইত্যাদি জনপ্রিয় গান জসীম উদ্দীনকে অবিস্মরণীয় করে রাখবে।
১৯৬৯ সালে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মান সূচক ডি লিট উপাধিতে ভূষিত করেন। এ ছাড়া রয়েছে একুশে পদক ১৯৭৬ ও স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ১৯৭৮ (মরণোত্তর)। ১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ বাংলার এ পল্লীকবি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। কবির কবর কবিতা অনুযায়ী ডালিম গাছের তলায় কবিকে সমাহিত করা হয়।
কবির মৃত্যুবার্ষিকী পালন উপলক্ষে ফরিদপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, সকাল ৮টায় কবির সমাধিস্থলে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সকাল ৮.১৫ মিনিটে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল। এছাড়াও ফরিদপুরের বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কবিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করবে।
মিয়া রাকিবুল/বার্তাবাজার/এ.আর