স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এলাকায় নেই স্বাস্থ্য বিধির বালাই, জানে না টিকা আসছে কি না?

চান্দইর। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার গড়পাড়া ইউনিয়নের একটি গ্রাম। এ গ্রামেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের বাড়ি। এ গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ কৃষি পেশার সঙ্গে জড়িত। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি এখনও। দেশের কোথায় কি ঘটছে এটাও জানেন না অনেকেই। মহামারি করোনাভাইরাস নিয়েও পিছিয়ে আছেন এখানকার মানুষ। মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি।

এলাকায় করোনার ভ্যাকসিন আসছে কি না সেটাও অধিকাংশ মানুষের অজানা। কেউ কেউ ভ্যাকসিনের তথ্য জানলেও তা গ্রহণ করতে রাজি নন। গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রীর গ্রামে সাড়ে ৩ ঘণ্টা ঘুরে টিকা নিয়েছেন এমন একজনের দেখা পাওয়া যায়। গ্রামের লোকজন মাস্ক ছাড়াই অবাধে চলাচল করছেন। গ্রামবাসী জানায়, করোনার টিকা সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষের ধারণা নেই। তারা জানেন না কোথায় গেলে এই টিকা পাওয়া যায়। এই টিকা টাকা দিয়ে কিনতে হয় কি-না এমন প্রশ্নও করেছেন কেউ কেউ। যদিও সরকারিভাবে বিনামূল্যে টিকা দেয়া হচ্ছে।

চান্দইর গ্রামের ঘোষাই দাস গণমাধ্যমকে বলেন, শুনেছি করোনা রোগে মানুষ অসুস্থ হয়ে মরেছে। আমাদের গ্রামে এখনো কেউ এই রোগে মরে নাই। গ্রামে করোনার টিকা আসছে কিনা জানি না। আমার পরিবারের কেউ এসব বিষয়ে কোনো কিছু শোনেনি। আমরা ক্ষেতে-খামারে কাজ করি। মাঝেমধ্যে হাটে-বাজারে যাই। কেউ আমাকে করোনার টিকা সম্পর্কে জানায়নি।

এসব নিয়ে কেউ কথাও বলে না। বেলা তখন ১২টা। টেনারী মোড়। সেখানে প্রায় ১৫/২০টি দোকান। প্রতিটি দোকানেই রয়েছে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি। তাদের কারো মুখে নেই মাস্ক। স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই নেই। একটু সামনে এগিয়ে গেলে চোখে পড়ে জীর্ণশীর্ণ একটা চায়ের দোকান। সেখানে ১৫/২০ জন আড্ডা দিচ্ছেন। চা খাওয়ার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছেন। তাদের মধ্যে একজন আব্দুল মতিন। টিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেই ছোট বেলায় টিকা নিয়েছি। এখনো দাগ রয়ে গেছে। করোনার টিকা নেইনি। টিকার বিষয়ে কিছু জানা নেই। কেউ আমাকে দেয়নি।

দেলোয়ার হোসেন নামের এক দোকানী বলেন, করোনার টিকা নেবো না। আমাদের এখানে এই রোগ নেই। আমার জানা মতে কেউ টিকা নেয়নি। এমনিতে মাস্ক পরে থাকি ধুলাবালি থেকে বাঁচার জন্য। করোনা নিয়ে কয়েকদিন আগে মাইকিং করেছে শুনেছি। এখন আর মাইকিং করতে শুনছি না। জানতে চাইলে রিকশাচালক আব্দুর রহমান বলেন, টিকার বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। শুনেছি হাসপাতালে টিকা দেয়া হয়। আমি হাসপাতালে যেতে পারি নাই। তিনি জানতে চান এই টিকার দাম কতো? নুরজাহান নামের এক কর্মজীবী নারী বলেন, সারাদিন ক্ষেত-খামারে কাজ করি। টিকা আসছে কিনা বলতে পারি না। আমাদের কেউ করোনার টিকা নেয়নি। দরকারও নেই।

কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজের গার্ড মো. তুহিন বলেন, আমি ১০ই ফেব্রুয়ারি করোনার টিকা নিয়েছি। প্রথমে জ্বর আসলেও পরে ঠিক হয়ে গেছে। আমি সুস্থ আছি। এই হাসপাতালে টিকাদানের শুরু থেকেই বিভিন্নস্থান থেকে টিকা নিতে মানুষ আসছে। তবে গ্রামের মানুষের মধ্যে আগ্রহ কম।

ফল বিক্রেতা হযরত আলী বলেন, মাস্ক পরি না। শুরুর দিকে মাস্ক ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য গ্রামে মাইকিং করা হয়েছে। তখন কাউকে কাউকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখেছি। এখন আর এসব দেখা যায় না। গতমাসে ভ্যাকসিন আসছে শুনেছি। লোকে নিতেছে। আমি নেইনি। আমার পরিচিত ৪/৫ জন নিয়েছেন। তারা সবাই সরকারি চাকরি করেন। তবে ব্যবসায়ী কিংবা গ্রামের সাধারণ মানুষদের ভ্যাকসিন নিতে শুনিনি। এখানকার মানুষের মধ্যে এসব নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই।

দুপুর ১টার দিকে চান্দইর কবরস্থান এলাকায় কথা হয় সফিজল হক নামের এক মুসল্লির সঙ্গে। তিনি বলেন, টিকার কথা শুনেছি। তবে টিকা দেবো না। গরিব মানুষের করোনা হয় না। আত্মীয়- স্বজন ও প্রতিবেশীদের অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি, কেউ নিতে চায় না। গ্রামের বহু মানুষ টিকা সম্পর্কে জানেই না। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড যাওয়ার পথে কর্নেল মালেক হাসপাতালে দেখেছি করোনার টিকা নেয়ার জন্য একটা পোস্টার আছে। অনেকেই টিকা নিচ্ছে। তাদের জ্বর উঠছে।

আবির হোসেন জয় নামের এক শিক্ষার্থী জানান, গ্রামের মানুষ সহজ সরল। করোনা আছে এটা অনেকেই বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না। স্বাস্থ্যবিধিও এখানে নেই বললেই চলে। দু’একজন মাস্ক পরে থাকলেও বিভিন্ন অযুহাত দেখিয়ে তা থুতনিতে ঝুলিয়ে রাখে। আর বয়স্ক ব্যক্তিরা ভ্যাকসিন নিতে চান না। আমরা যারা প্রতিনিয়ত ভ্যাকসিনের খোঁজখবর রাখি। বয়স কম হওয়ায় আমরা ভ্যাকসিন নিতে পারছি না।

শাহী মিয়াবাড়ির মসজিদ এলাকার বাসিন্দা হোসেন ব্যাপারী বলেন, গ্রামে করোনা রোগ নাই। শুনেছি টিকা আসবে। এখন আপনার কাছে জানতে পারলাম হাসপাতালে টিকা আসছে। আমাকে টিকা দিলে আমি নেবো।

মন্ত্রীর বাড়ির সামনেই ব্যবসা করছেন নাঈম আহমেদ। তিনি বলেন, এখনো টিকা নেইনি। অনেকে নিয়েছেন। আমার বোন ও দুলাভাই হেল্‌থে চাকরি করেন। তারা প্রথমেই টিকা নিয়েছে। টিকা নিবন্ধন করতে নাকি অনলাইনে আবেদন করতে হয়। দেখি আরো কয়েকদিন যাক, তারপর টিকা নেবো।

দুপুর ৩টায় সাহেরা হাসান মেমোরিয়াল হাসপাতালের সামনে ফয়েজ নামের এক স্কুল শিক্ষক বলেন, টিকা সম্পর্কে প্রথমদিকে এলাকায় মাইকিং করতে শুনেছি। এখন সেই প্রচার-প্রচারণা নেই। এমনিতেই গ্রামবাসী করোনাকে পাত্তা দিতে চায় না। তারা ভাবে গরিব মানুষের করোনা হবে না। এজন্য টিকা নিয়ে তাদের আগ্রহ নেই। স্বাস্থ্যবিধিও তোয়াক্কা করেন না। পাড়া-মহল্লায় সবাই মাস্ক ছাড়াই চলাফেরা করেন।

তিনি আরো জানান, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এলাকা হিসেবে এখানকার মানুষের বেশি টিকা নেয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ উল্টো। এ ছাড়া আমি শিক্ষকতা করি। আমি টিকার জন্য অনলাইনে আবেদনের চেষ্টা করেছি। আমার আবেদন নেয় না। বয়সের সমস্যা দেখাচ্ছে। একইচিত্র পার্শ্ববর্তী রাইল্যা, বান্দুরি, বাসিয়ালি কৃষ্টুপুর গ্রামে।

এদিকে, সাটুরিয়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাস্ক ছাড়াই চলাচল করছেন সেখানকার জনগণ। নেই কোনো শারীরিক দূরত্ব মানার বালাই। একে অন্যের শরীর ঘেঁষে চলাফেরা করছেন। হোটেল-মোটেল আর কেনাকাটার দোকানগুলোর অবস্থা আরো ভয়াবহ। গাদাগাদি করে কেনাকাটা করতে দেখা গেছে অনেককেই। সূত্র: মানবজমিন।

বার্তাবাজার/ই.এইচ.এম

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর