ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন কিশোর

কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে গত বছরের ২ মে রাজধানীর কাকরাইলের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার দেখায় র‍্যাব-৩। গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত টানা ৬৯ ঘন্টা অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে তাকে করা হয়েছে দফায় দফায় নির্যাতন।

বৃহস্পতিবার (৪ মার্চ) আইনজীবীর কার্যালয়ে এই অমানুষিক নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি ভেঙে পড়েন কান্নায়। এসময় তিনি তার শরীরে বয়ে বেড়ানো নির্যাতনের ক্ষত চিহ্নও দেখান।

আতকের পর কিশোরকে র‍্যাব কার্যালয়ে নেওয়া হলে সেখানে দেখা হয়েছিল লেখক মুশতাক আহমেদের সাথে। কথা ছিল মুক্ত হওয়ার পর দু’জনই হিমালয়ে ঘুরতে যাবেন। সেটা আর যাওয়া হলো না। কিশোরের জামিন মিললেও কারাগারেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছে মুশতাককে।

মুশতাকের বিষয়ে কিশোর জানান, র্যাব কার্যালয়ে সেদিন মুশতাক আহমেদ আমাকে বলেছিলেন, মুখ গোমড়া করে রেখেছিস কেন? আমরা কি কোনো অন্যায় করেছি? বুক চিতিয়ে দাঁড়া। জামিনে মুক্ত কিশোর গ্রেপ্তারের পর অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।

নির্যাতনের বিষয়ে কিশোর জানান, ২রা মে রাতে ১৬-১৭ জন আইনশৃঙ্খলা পরিচয়ে বাসায় ঢুকে। একজন বলেছিলেন, তাঁর নাম জসিম। অন্তত চারজনের কাছে ছোট অস্ত্র ছিল, কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল না। ঘরে ঢুকেই তল্লাশি শুরু করেন। পুরো বাসা একরকম লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে কিশোরের মুঠোফোন, সিপিইউ, পোর্টেবল হার্ডডিস্কসহ যত ডিজিটাল ডিভাইস ছিল, সব নিয়ে কিশোরকে হাতকড়া পরান। তারপর নিচে নামান। বাসার সামনে তখন ৬-৭টি গাড়ি। কিশোর চেঁচামেচি শুরু করেন এ সময়। কাকরাইলে বাসার সামনে লোক জমে গেলে নাক পর্যন্ত ঢাকা বিশেষ ধরনের টুপি পরিয়ে কিশোরকে গাড়িতে তোলেন তাঁরা। উচ্চ শব্দে গান ছেড়ে দিলে কিশোরের চিৎকার মিলিয়ে যায়। এরপর তাকে নিয়ে যায় অজ্ঞাত স্থানে।

তিনি জানান, প্রথমে একটি স্যাঁতসেঁতে ঘরে নিয়ে যায়। অনেক রাতে তুলে তাঁকে নেওয়া হয় অন্য একটি কক্ষে। ওই ঘরেও ছিলেন বেশ কয়েকজন। তাঁদের সবাই কার্টুনিস্ট কিশোরকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করছিলেন। চেয়ারে বসিয়ে কেউ একজন ইংরেজিতে বলেন, পেছনে তাকালে জানে মেরে ফেলবেন। এরপর প্রজেক্টরে একটার পর একটা কার্টুন দেখিয়ে মর্মার্থ জানতে চাওয়া হয়।

বেশ কিছু কার্টুন দেখিয়ে, এগুলো কেন আঁকা হয়েছে, কার্টুনের চরিত্রগুলো কারা, তা জানতে চায়। একপর্যায়ে প্রচণ্ড জোরে কানে থাপ্পড় দেয়। কিছুক্ষণের জন্য বোধশক্তিহীন হয়ে পড়ি। বুঝতে পারি, কান দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। এরপর স্টিলের পাত বসানো লাঠি দিয়ে পায়ে পেটাতে থাকে তারা।

নির্যাতনের এক পর্যায়ে তারা জানতে চান, কার কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ, কেন যোগাযোগ। সুইডেনপ্রবাসী সাংবাদিক তাসনীম খলিলের সঙ্গে তাঁর কীভাবে যোগাযোগ, ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকে কী করে চেনেন- এসব প্রশ্ন করেন। ব্লগারদের ওপর আবার হামলা হতে পারে, এই আশঙ্কার কথা কেন আসিফ মহিউদ্দীনকে বলেছেন, জানতে চান তাঁরা। জবাবে কিশোর বলেছিলেন, তাঁর মনে হচ্ছিল, কেউ তাঁকে অনুসরণ করে। তবে তাঁর কোনো জবাবই মনঃপুত হচ্ছিল না প্রশ্নকর্তাদের।

কিশোর বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের একটা অংশজুড়ে বেসরকারি একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। তিনি ওই ব্যবসায়ীকে কীভাবে চেনেন, কেন ওই ব্যক্তির কার্টুন এঁকেছেন, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদের পর কিশোরকে র্যাবের কার্যালয়ে রেখে আসা হয়।

ওখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় লেখক মুশতাক আহমেদের। বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছিল বলে মুশতাক জানিয়েছিলেন কিশোরকে। পরে ৬ মে সকালে রমনা থানায় সোপর্দ করা হয় কিশোর ও মুশতাককে।

তবে নির্যাতনের কথা অস্বীকার করে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। গত বছরের মে মাসে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়েছে। এত পরে এমন অভিযোগ উঠলে প্রশ্ন ওঠার অবকাশ থাকে।

বার্তাবাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর