গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ এবং আপিলের রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দেন। হাইকোর্ট মামলার রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়ে বলেন, কোটালীপাড়ায় বোমা হামলার প্রচেষ্টার মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল।
পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সমগ্র জাতিকে পিছিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিলো। সেই অবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার উন্নত দেশ গঠনের চেষ্টা শুরু করলে তার (প্রধানমন্ত্রীর) জনপ্রিয়তাকে ধ্বংস করতে ভয়ঙ্করভাবে চেষ্টা চালানো হয়েছিল। এটি দেশের জন্য একটি কালো অধ্যায়, জঘণ্য ও বর্বরোচিত অধ্যায়।
সেদিন কোটালীপাড়ায় বোমাগুলো ফুটলে বোমা পুঁতে রাখার স্থান থেকে চারপাশে এক কিলোমিটার ধ্বংসাবশেষে পরিণত হত। মাটির নীচেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি হত। সবকিছু মিলিয়ে ওই হামলা সফল হলে চারপাশ ধ্বংস লীলায় পরিণত হতে পারতো।
এ সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. মো. বশির উল্লাহ। অন্যদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. নাসির উদ্দিন ও মোহাম্মদ আহসান।
এর আগে, হাইকোর্টের রায়ে আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১০ আসামির সাজা বহাল রাখা হয়। বিচারিক আদালতে ১০ আসামির মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আসামি মেহেদি হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া আসামি আনিসুল ওরফে আনিস, মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান এবং সরোয়ার হোসেন মিয়াকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অনাদায়ে আরো এক বছরের দণ্ড দেন বিচারিক আদালত।
তবে এসব আসামিদের ক্ষেত্রে মেহেদি হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বহাল, আসামি আনিসুল ইসলাম ওরফে আনিস ও মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমানের ১৪ বছর সাজা খাটা হলে মুক্তি প্রদান এবং আসামি সরোয়ার হোসেন মিয়াকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।
২০১৭ সালের ২০ আগস্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মমতাজ বেগম ১০ জঙ্গির সর্বোচ্চ শাস্তি দেন। আদালত গুলি করে প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন। এছাড়াও চার আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।
মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন ওয়াশিম আখতার ওরফে তারেক হোসেন, মো. রাশেদ ড্রাইভার ওরফে আবুল কালাম, মো. ইউসুফ ওরফে আবু মুসা হারুন, শেখ ফরিদ ওরফে মাওলানা শওকত ওসমান, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বক্কর, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই ও মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর।
পরে এ মামলার রায়সহ সব নথি ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর প্রধান বিচারপতির কাছে নথি উপস্থাপন করা হলে তিনি জরুরি ভিত্তিতে এ মামলার পেপারবুক তৈরির নির্দেশ দেন। প্রধান বিচারপতির নির্দেশে এরই মধ্যে পেপারবুক তৈরি হলে হাইকোর্টে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। কিন্তু হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ কয়েকবার পুনর্গঠন হওয়ায় মামলাটির শুনানি পিছিয়ে যায়। এরপর মামলার শুনানি শেষে এ রায় দিলেন হাইকোর্ট।
উল্লেখ্য, ২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। শেখ লুৎফর রহমান মহাবিদ্যালয়ের উত্তর পাশের একটি চায়ের দোকানের পেছনে এ বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় তৎকালীন কোটালীপাড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নূর হোসেন একটি মামলা দায়ের করেন। পরে ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে ২০০৯ সালের ২৯ জুন আরো নয়জনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরপর ২০১০ সালে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য ঢাকা-২ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
বার্তাবাজার/ভি.এস