করোনা সংকটের রেশ এখনো কাটেনি বেঁদে পরিবরের। এমনটি ব্যাক্ত করেন ভোলার ভেদুরিয়া ফেরীঘাটে স্থান নেয়া ভাসমান বেদে বহরের সর্দার মনু।
মনু বলেন, আমরা সাধারণত প্রতি বছরের মাঘ মাসের দিকে বহর নিয়ে বের হয়ে জৈষ্ঠ আষাঢ় মাস অবদি দেশের ভিবিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে শিংগা টানা,কড়ি মালা,ভেষজ উদ্ভিদ ফলের মালা,সাপ ধরা, সাপ খেলা দেখানো সহ প্রভৃতি কাজ করে থাকি। বর্ষা মৌশুম আসার পুর্বেই আমরা নিজ নিজ গাঁও বিক্রমপুরে চলে যাই। কিন্ত গেল বছর আমাদের মৌসুম শুরুর দিকে করোনা নামক মহামারি দেখা দেয়ায় আমরা কাজে নামতে পারিনি। তখন অর্ধাহারে অনাহারে আমাদের জীবন কাটছে। করোনার এই প্রভাব এখনো রয়েছে আমাদের পরিবারে আমরা এখন মহল্লায় গেলে আগের মত কেনা বেচা হয়না বলে জানান বেদে ময়না ও হাজু। এরা সাধারণভাবে বাদিয়া বা বাইদ্যা নামে পরিচিত একটি ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী।
কথিত আছে যে, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে শরণার্থী আরাকানরাজ বল্লাল রাজার সাথে এরা ঢাকায় আসে। পরবর্তীকালে তারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নেয়। এরা প্রথমে বিক্রমপুরে বসবাস শুরু করে এবং পরে সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামেও তারা ছড়িয়ে পড়ে। বেদের আদি নাম মনতং বা মাংতা। বেদে নামটি অবজ্ঞাসূচক বাইদ্যা (হাতুড়ে ডাক্তার), পরিমার্জিত ‘বৈদ্য’ (চিকিৎসক) থেকে উদ্ভূত। অধিকাংশ বেদেই চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত বলে মনতংরা কালক্রমে বেদে নামে অভিহিত হয়। বেদেরা আরাকান রাজ্যের মনতং আদিবাসী গোত্রের দেশত্যাগী অংশ। তাই এরা নিজেদের মনতং বলে পরিচয় দিতে বেশি আগ্রহী। যুদ্ধ ও শিকারে অতিশয় দক্ষ বেদেরা কষ্টসহিষ্ণু ও সাহসী। এদের গাত্রবর্ণ ও আকৃতি বাঙালিদের মতোই।
বেদেরা কৌমসমাজের রীতিনীতি মেনে চলে ও দলবদ্ধ হয়ে থাকে। গোত্রপ্রীতি প্রবল বলে সদস্যরা প্রত্যেকে একে অন্যকে নানাভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে বেদেরা পিতৃপ্রধান সমাজ হলেও মেয়েরা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বেদে ছেলেরা অলস প্রকৃতির। সব রকমের কঠোর পরিশ্রম মেয়েরাই করে থাকে। বেদেরা সাধারণত সমতল ভূমিতে নদী-নালার আশপাশে দলবদ্ধভাবে মাচা তৈরি করে অথবা নৌকায় বাস করে।
তাই নৌকা এদের অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ বলেও জানান ছিরম সর্দার। বছরের অধিকাংশ সময় বিশেষ করে ফসল তোলার মৌসুমে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে এরা বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে পরিভ্রমণ করে। এই পরিভ্রমণকে বেদেদের ভাষায় গাওয়াল বলে। মহিলারাই বেশি গাওয়ালে যায়। তাদের সাথে থাকে সাপের ঝাঁপি বা ঔষধের ঝুলি। এরা সপরিবারে গাওয়ালে যায় শীতের শুরুতে পৌশ মাসের শেষের দিক থেকে আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এরা গাওয়াল করে।
গাওয়ালের সময় এরা স্থানীয়ভাবে মূলত নৌকা, তাঁবু বা কোন স্কুল ঘরের বারান্দায় সপরিবারে থাকে। গাওয়াল শেষে দলবদ্ধভাবে আবার স্থায়ী ঠিকানায় ফিরে আসে। গাওয়ালে এরা হেঁটে যায় কিংবা নৌকা ব্যবহার করে থাকেন বলেও জানান তারা।
স্থায়ী আবাসে ফিরে বেদেরা সাধারণত বিভিন্ন আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করে। এসব উৎসবেই বর-কনে পরস্পরকে পছন্দ ও অভিভাবকের সম্মতিতে বিয়ে করে। বিয়ের ব্যাপারে যুবক-যুবতীর পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে। বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর ঘরে যায় এবং স্ত্রীকে স্বামী ও সন্তানের লালন-পালনের জন্য ওয়াদা করতে হয়। বেদেদের নাচ-গানের আসরে বহিরাগত কেউ উপস্থিত থাকলে তাকে প্রলুব্ধ করে বেদে তরুণীকে বিয়ে করার জন্য উৎসাহিত করা হয়। বিয়ে হয়ে গেলে তাকে নিজেদের গোত্রে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বহিরাগত কোন যুবক বেদে যুবতীকে ফুঁসলিয়ে বিয়ে করলে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এদের সমাজে বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও যৌথপরিবার প্রথা নেই। বিধবা বিবাহে কোন বাধা নেই। মুসলমান হলেও বেদে মেয়েরা পর্দা করে না। মহিলারা অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ছাড়াছাড়ি হলে সম্পত্তি এমনকি পুত্র-কন্যারও বিভাজন হয়, যার বেশির ভাগ পায় স্ত্রী এমনটিও জানান ৮০ বছর বয়সি মনু সর্দার ।
প্রতিটি পরিবারে নিজস্ব নৌকা থাকে। কয়েকটি পরিবার ও নৌকা নিয়ে হয় দল আর কয়েকটি দল নিয়ে হয় বহর। কয়েকটি বহর নিয়ে গঠিত হয় উপগোত্র। বহরের দলপতি সর্দার নামে পরিচিত। প্রতি বহরের জন্য আছেন একজন করে দলপতি যিনি সর্দার নামে পরিচিত। সর্দার তার বহরকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে প্রতিটি দলে একজন করে পরিচালকের মাধ্যমে তার কাজ পরিচালনা করেন। সর্দার প্রতিটি দলের বাণিজ্যপথ ও এলাকা নির্ধারণ করেন যাতে দলের অন্যান্য সদস্য প্রয়োজনের সময় তার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। বহরের প্রশাসনিক ও নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষার সকল দায়িত্ব সর্দারের। সর্দার নিয়মভঙ্গকারীকে শাস্তি দেন ও বিভিন্ন বিরোধের সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে রায় দেন। বিচার কার্যের শুরুতেই বাদি-বিবাদি উভয় পক্ষকেই জামানত হিসেবে সর্দারের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত রাখতে হয়। বিচারে যে হেরে যায় তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এই বাজেয়াপ্ত অর্থ খরচ করে বহরের লোকদের খাওয়ানো হয়। পূর্বনির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন দল গাওয়াল থেকে স্থায়ী ঠিকানায় ফিরে আসতে ব্যর্থ হলে সর্দার কৈফিয়ৎ তলব করে শাস্তি দিতে পারেন। সর্দারের ভরণপোষণের দায়িত্ব বহরের। বিয়ের সময় সর্দারকে বিশেষ ফিস দিতে হয়। বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান উপলক্ষেও সর্দার উপহার পেয়ে থাকেন
বহরের জন্য যেমন সর্দার আছেন ঠিক তেমনি আছেন উপগোত্রীয় ও গোত্রীয় সর্দার। বছরে একটি নির্দিষ্ট সময়ে পূর্বনির্ধারিত স্থানে বহরের সর্দাররা মিলিত হয়ে উপগোত্রীয় ও গোত্রীয় সর্দার নির্বাচন করেন।
বার্তাবাজার/ভি.এস