ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় পানি ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশ জলবায়ুর পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের নির্দোষ শিকার। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির দিক থেকে বিশ্বের ১৭১ টি দেশের মধ্যে সর্বাপেক্ষা দুর্যোগপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। জার্মানভিত্তিক গবেষণা সংস্হা ‘জার্মানওয়াচ’ এর ২০১৯ সালের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নবম।

প্রকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। ২০ লাখের কম জনসংখ্যার কয়েকটি ক্ষুদ্র দ্বীপ অর্থনীতি বাদে নদ-নদীসহ মোট ১৪৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে ১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি।

জোয়ারের স্ফীতি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি বন্যা, নদী ভাঙ্গন, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশের জন্য নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাসহ উপকূলীয় এলাকার জনগণের জীবন ও জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এছাড়াও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকায়ও সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের নদীগুলিতে মিঠা পানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার কারণে কৃষি কাজসহ অন্যান্য কাজে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌসুমী বৃষ্টিপাত বৃদ্ধিসহ ঘন ঘন বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। এতেকরে ঐ অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।আবার দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের শুষ্ক এলাকায় চাষাবাদের জন্য অধিকমাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারের কারণে পানির স্তর অনেক গভীরে নেমে যাচ্ছে।

ফলে পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ঐ অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকায় এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDGs) এর জলবায়ু কার্যক্রম ১৩.৩ “জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রভাব প্রশমন, অভিযোজন, প্রভাব কমানো এবং আগাম সতর্ক বার্তা সম্পর্কিত শিক্ষা ও সচেতনতা এবং মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার উন্নতি সাধন করা” এটি বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব “পরিবেশ ও বন” মন্ত্রণালয়। সহযোগী মন্ত্রণালয় হিসেবে “তথ্য” মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে প্রতি ৩-৫ বছরে বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চল বন্যাপ্লাবিত হয়।ফলে অবকাঠামো, বাসস্থান, কৃষি এবং জীবন-জীবিকার ব্যাপক ক্ষতি হয়। Inter -governmental Panel on Climate Change (IPCC) এর প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের ভূমির ১৭ শতাংশ এবং খাদ্য উৎপাদনের ৩০ শতাংশ হারিয়ে যাবে।

বাংলাদেশে পূর্বাঞ্চলের চেয়ে পশ্চিমাঞ্চলে দারিদ্র্যতা বেশি। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলিতে দারিদ্র্যের হার অনেক বেশি। সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের পরেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় এ দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনা যাচ্ছে না। এখন এজন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ। এত সব সমস্যার পরও বাংলাদেশের সম্ভবনা অনেক। এখানকার মাটি উর্বর, বহুবিধ ফসল চাষের সুযোগ পৃথিবীর অনেক দেশের থেকে বেশি।

নদীপথ দেশের বড়ো বড়ো বাণিজ্যিক শহরগুলোর সাথে সংযুক্ত। স্বল্পব্যয়ে অধিক পণ্য নিরাপদে খুব সহজেই অভ্যন্তরীণ নৌপথে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পৌঁছানো সম্ভব। উন্নত প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক উপকরণ ব্যবহার করে আমাদের নদী ও স্হলবন্দরসমূহের দক্ষতা অনেকগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং হচ্ছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।

নদীগুলোর নাব্যতা বজায় রাখতে ড্রেজিংসহ অন্যন্য কার্যকর পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। দেশে একটি সমন্বিত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। এর সম্প্রসারণ কার্যক্রম চলমান আছে। সমুদ্র, নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর জলাভূমি থেকে আহরিত মৎস্য সম্পদ একদিকে আমাদের আমিষের চাহিদা পূরণ করছে অপরদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দারিদ্র্য নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে পরিকল্পিতভাবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে এখাতে বিনিয়োগ বাড়বে, আরো বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশের মানুষের আমিষের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। সরকার সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।

সামুদ্রিক সম্পদের পরিমাণগত ধারণা ও এসংক্রান্ত জ্ঞানের ঘাটতি পূরণে ব্যপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। যে সকল দেশ ইতিমধ্যে এ বিষয়ে সফল হয়েছে সে সকল দেশ থেকে কারিগরি সহায়তা গ্রহণ করা হচ্ছে। আশা করা যায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশেও এবিষয়ে দক্ষ জনবল সৃষ্টি হবে।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ গ্রহণ করে। এতে জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে আমাদের পানি, পরিবেশ, প্রতিবেশ, ভূমি ব্যবস্হাপনার ইত্যাদি দীর্ঘ মেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব যা সমাজের সকলস্তরের জনগণকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আঘাত করে। এরমধ্যে সমাজের পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন জীবিকার উপর এর ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়।

ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত জলবায়ু (পানি ব্যবস্হাপনা) সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোকে ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ছয়টি অঞ্চল হলো উপকূলীয় অঞ্চল, নদী অঞ্চল ও মোহনা, নগর এলাকাসমূহ, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, হাওড় এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চল এবং ক্রস কাটিং অঞ্চল। এরমধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১৩ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এগুলো হলো পশ্চিম গোপালগঞ্জ সমম্বিত পানি ব্যবস্হাপনা প্রকল্প,ভবদহ এলাকার পানি নিষ্কাশণ ব্যবস্হার উন্নয়ন প্রকল্প, ভোলা দ্বীপ অঞ্চলের পানি ব্যবস্হাপনা অবকাঠামো উন্নয়ন, চর ডেভেলপমেন্ট এন্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট-৫, প্রোগ্রাম ফর ইমপ্লিমেন্টেশন র‌্যাশনালাইজড ওয়াটার রিলেটেড ইনটাভেনশন ইন গোমতি- মহুরি বেসিন, প্রোগ্রাম ফর ইমপ্লিমেন্টেশন র‌্যাশনালাইজড ওয়াটার রিলেটেড ইনটাভেনশন ইন গড়াই- পশুর বেসিন, র‌্যাশনালাইজেশন অব পোল্ডারস ইন বলেশ্বর-তেঁতুলিয়া বেসিন, প্রোগ্রাম ফর ইমপ্লিমেন্টেশন অব র‌্যাশনালাইজড ওয়াটার রিলেটেড ইনটাভেনশন ইন বলেশ্বর-তেঁতুলিয়া বেসিন, র‌্যাশনালাইজেশন অব পোল্ডারস ইন গোমতি-মুহুরি বেসিন, র‌্যাশনালাইজেশন অব ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইন ভোলা ডিস্ট্রিক্ট, স্টাডি অন ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট ড্রেইনেজ কনজেসশন ফর গ্রেটার নোয়াখালী, স্টাডি অন টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট এবং কনস্ট্রাকশন অব গ্যাঞ্জেস ব্যরেজ এন্ড এন্সিলারি ওয়ার্কাস।

নদী অঞ্চল ও মোহনা ক্যাটাগরিতে মোট ৫ টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এগুলো হলো প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি অন ইন্টিগ্রেটড রিভার সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট এন্ড প্রটেকশন অব এক্রিটেড ল্যান্ড, রিভার ব্যাংক ইমপ্রুভমেন্ট, ইন্টিগ্রেটেড যমুনা-পদ্মা রিভারস স্টাবিলাইজেশন এন্ড ল্যান্ড রিক্লেমেশন প্রজেক্ট, ডেভেলপমেন্ট অব চন্দনা-বরাশিয়া রিভার বেসিন সিস্টেম, এনহ্যান্সমেন্ট অব এগ্রিকারচারাল প্রোডাক্টাভিটি টুয়ার্ডস ফুড সিকিউরিটি ইন চর ল্যান্ডস।

নগর এলাকা ক্যাটাগরিতে মোট ০৫ টি প্রকল্প রয়েছে। এগুলো হলো ড্রেইনেজ ইমপ্রুভমেন্ট অব ঢাকা-নারায়নগঞ্জ-ডেমরা প্রজেক্ট( ফেয-২), ইমপ্রুভমেন্ট অব ড্রেইনেজ কনজেসশন,ক্যানাল ড্রেজিং এন্ড ফ্লাড ফর বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এরিয়া, ইমপ্রুভমেন্ট অব ড্রেইনেজ নেটওয়ার্ক, ফ্লাড কন্ট্রোল এন্ড সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ফর খুলনা সিটি, প্রজেক্ট ফর ইমপ্রুভমেন্ট অব স্টর্ম ওয়াটার ড্রেইনেজ এক্টিভিটিস ইন দি সিটি কর্পোরেশন এরিয়া, প্রটেকশন অব রিভার সিস্টেম এ্যারাউন্ড ঢাকা সিটি উইথ দেওয়ার ইকোলজিকাল রেস্টোরেশন। এ ১৩টি প্রকল্পসহ সর্বমোট ৩৪ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ সকল প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ৩ লক্ষ ৬ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা।

ভৌগোলিক দিক থেকে তিনটি নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ জলবায়ুর পরিবর্তনজনীত ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় প্রথম দিকে রয়েছে। আমরা ইচ্ছা করলেই রাতারাতি এ ঝুঁকি মুক্ত হতে পারি না। তবে পরিকল্পিতভাবে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে জলবায়ুর পরিবর্তনজনীত ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব।

এজন্যই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘমেয়াদি শতবর্ষী ব-দ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণ করে সমন্বিত পানি ব্যবস্হাপনাকে কাজে লাগিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছেন।

বার্তাবাজার/হৃ.আর

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর