৯ বছর ধরে চোখের জলে সাগর-রুনীর বসবাস

আজ ভয়াল ১১ ফেব্রুয়ারি। ২০১২ সালের এই দিনে রাজধানীর রাজবাজারে ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনিকে। হত্যাকাণ্ডের ৯ বছর পরেও কোনো সুরাহা হয়নি, কোনো বিচার হবে দূরে থাকুক ৭৬ বারেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

২০১২ সালে সাগুর-রুনীকে হত্যা করার পর তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর চেয়ার অলংকৃত করা অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে। কিন্তু সেই ৪৮ ঘন্টা আর শেষ হয়নি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে পদায়ন পেয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী হয়েছেন সাহারা খাতুন। মন্ত্রীত্ব হারিয়ে আওয়ামী লীগের বড় পদে বসেছেন। গত বছর তিনি মারাও গিয়েছেন। এর মাঝে ৭৬ বার পিছিয়েছে সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন জমাদানের সময়।

এদিকে বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে নিহতের পরিবারের সদস্যরা ওই ঘটনায় বিচার হবে এমন আশাও ছেড়ে দিচ্ছেন।

ভয়ঙ্কর এই হত্যাকাণ্ডের পর নিহত রুনীর ভাই নওশের রোমান বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। তার এখন ধারণা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছার অভাবেই মামলার তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই।

তিনি জানান, শুরুর দিকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সাথে যোগাযোগ করলেও গেল কয়েকবছর ধরে কোনো সাড়াশব্দ নেই। আমাদের পরিবার হতাশ। হয়তো এমন কেউ এটার সাথে জড়িত যার জন্য হয়তো চায়নি বের করতে।

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মামলা হওয়ার পর প্রথমে এর তদন্তে নামে শেরে বাংলা থানা পুলিশ। চারদিনের মাথায় মামলা হাতবদল হয় ডিবি পুলিশের কাছে। এর ৬২ দিনের মাথায় ডিবি আদালতে ব্যর্থতা স্বীকার করলে তদন্তের দায়িত্ব পায় র‍্যাব।

দায়িত্ব নিয়েই সাগর ও রুনির মরদেহ কবর থেকে তুলে এনে আবারো ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা পরীক্ষা করে র‍্যাব। বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হলেও তদন্ত আর এগোয়নি।

এখনকার বাস্তবতা হচ্ছে, র‍্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়ার জন্য এখন পর্যন্ত ৬০ বারের বেশি সময় নিয়েছেন।

সেসময় এই ঘটনা নিয়ে তদন্ত করেছিলেন সাংবাদিক হারুন উর রশীদ, যিনি মনে করেন নানা কারণে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তদন্ত ব্যহত করার চেষ্টার কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে তদন্তের স্বচ্ছতা ও তদন্তকারীদের সদিচ্ছার বিষয়টি।

তিনি বলেন, “সেসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন ৪৮ ঘন্টার মধ্যে হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে, পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে তারা ক্লু খুঁজে পেয়েছেন, এমনকি পুলিশের মহাপরিদর্শক বলেছিলেন তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তার পরেও কোনো সুরাহা হয়নি।

“যে জিনিসটা তারা সেসময় বলেছিলেন যে আমরা পেয়ে গেছি, সেটি দূরবর্তী ঘটনায় পরিণত হওয়ার কী কারণ থাকতে পারে?”

হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সেসময় আটজনকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে দু’জন বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

তবে হত্যার সাথে এই আটককৃতদের সম্পৃক্ততা আসলে কতটুকু, সেবিষয়েও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কখনোই পরিস্কার কোনো তথ্য দেননি।

সেসময় চাঞ্চল্যকর এই হত্যার ঘটনার অনুসন্ধান করা সাংবাদিকদের অনেকে মনে করেন, তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গত কয়েকবছর নীরবতা পালন করায় তদন্ত আরো বেশি ব্যহত হচ্ছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমে র‍্যাব অবশ্য সবসময়ই বলে এসেছে তদন্তের স্বার্থেই তারা এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না।

সেসময় এই ঘটনা নিয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলো ব্যাপক আন্দোলন করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তা স্তিমিত হয়ে যায়।

বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের মতে, সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যু নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কার্যকরভাবে চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি।

এই খুনের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো ডিএনএ নমুনার পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পেলে মামলার রহস্য উদঘাটন হবে বলে এর আগে র‍্যাবের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছিলেন।

তবে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পেলেই যে অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব হবে – তেমনটি নাও হতে পারে। তথ্যসূত্র-বিবিসি বাংলা।

বার্তাবাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর