‘আমার সহধর্মীনি ও দুই সন্তান আমায় রেখে চলে গেলো। ওরা আমার সাথে ফোনে কথা না বলে একদিনও ভাত খায়নি। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় আমার স্বপ্ন প্রধীপ নিমিশেই নিভে গেলো।’ কথা গুলো বলছিলেন বাস ও ট্রাকের রেষারেষিতে পিষ্ঠ হয়ে স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে হারানো বাবা মো. মাসুদুর রহমান (৫০)।
সড়ক দুর্ঘটনায় রোববার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১২ টার দিকে সিরাজগঞ্জ শহরের এস বি ফজলুল হক সড়কের কালাচাঁন মোড় এলাকায় এমন দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বনবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক ও সিরাজগঞ্জ পৌরসভার মিরপুর দক্ষিন মহল্লার মৃত ইসাহাক তালুকদারের মেয়ে ইফরাত সুলতানা রুনী (৪০) সহ তার ছেলে মাশবুবুর রহমান (১২) ও মেয়ে সোয়াইবা রহমান (৬) নিহত হয়। তবে বেচে যান অটো চালক চান মিয়া।
সোমবার (৮ ফেব্রুয়ারি) নিহত পরিবারের সাথে কথা বলতে গেলে জানা যায়, নিহত স্কুল শিক্ষিকার স্বামী মো. মাসুদুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলা বিভাগ হতে স্নাতকোত্তর শেষ করে সিরামিক শিল্পের কাজে জড়িয়ে পড়ে ঢাকা হেমায়েতপুর সাভার এলাকায় বসবাস করেন।
মাসুদুর রহমান ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার মোয়াজ্জেমপুর ইউনিয়নের কালেঙ্গা গ্রামের বজলুর রহমানের ছেলে। ২০০৭ সালের দিকে ইফরাত সুলতানা রুনীর সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। চাকরির স্থান সিরাজগঞ্জে হওয়ায় রুনী তার ছেলেমেয়ে নিয়ে বাবার বাসায় থাকতো।
এ সময় নিহত শিক্ষিকার বড় ভাই মুসফেকুস সাহেহীন কান্নাকন্ঠে বলেন, আমার বোনের সংসারে আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। ছেলেটা থাকতো চুপচাপ আর মেয়েটা ছিল উল্টো। তার স্বপ্ন ছিল আকাশ ছোঁয়া। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় সেই স্বপ্নটাও নিভে গেল। ভাগ্নে মাশবুবুর রহমান সবুজ কানন স্কুল এন্ড কলেজের ৬ষ্ঠ শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী ও ভাগ্নি সোয়াইবা রহমান শহীদ মডেল স্কুলের নার্সারী শ্রেণিতে পড়তো।
রোববার ১২ টার দিকে চশমা মেরামতের জন্য অটোরিকশায় শহরে যাওয়ার পথে এস বি ফজলুল হক সড়কের কালাচাঁন মোড় এলাকায় বেপরোয়া বাস ও ট্রাকের রোষানলে পিষ্ঠ হয়ে সবাই মারা যায়। কে জানতো ওটায় ছিলো ওদের বাড়ি থেকে শেষ বের হওয়া। নিহত মেধাবী মাশবুবুর রহমান ও সোয়াইবা রহমানের খেলার সাথী জিম, নাহিয়ান ও অফি দৌড়ে এসে বলেন, ওরা দুজনই আমাদের সাথে নিয়মিত
খেলাধুলা করতো।
স্কুল বন্ধ থাকায় সেদিন সকালে ওদের বাড়ির উঠানে খেলাধুলা করার সময় হঠাৎ করে মাশবুবুর ভাইয়ার চশমা ভেঙ্গে যায়। পরে ওর মা ওদের সাথে নিয়ে অটোরিকশায় চশমা মেরামত করতে যাওয়ার পথেই বাসের চাপায় সবাই মারা গেছে। এই বলেই বাকরুদ্ধ হয়ে যায় কোমলমতি শিশুরাও।
এদিকে জীবন সঙ্গী ও দুই সন্তানকে হারিয়ে অনেকটা নিশ্চুপ হয়ে গেছে মাসুদুর রহমান। এখনো তাদের ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকেন।
তিনি বলেন, মনে হয় এই বুঝি ওর মা আর ওরা এসে, বাবা বলে ডাকছে। তখন বুকটা ফেঁটে যায়। এটা তো দুর্ঘটনা না, আমার স্বপ্নকে চুরমার করে দেওয়ার যন্ত্রণা। এভাবে সড়ক দুর্ঘটনা যেন আর কোনো বাবার কোল খালি না করে। মাসুদুর রহমানের বাবা বজলুর রহমান বলেন, প্রাণবন্ত বউ মা ও আমার আদরের নাতি-নাতনিকে হারিয়ে আমার সন্তান যেন থমকে গেছে। কবে স্বাভাবিক হবে জানি না।
সদর উপজেলার বনবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা শাহনাজ পারভীন মুঠোফোনে বলেন, ইফরাত সুলতানা রুনী একজন আদর্শ শিক্ষিকা ছিলেন। তিনি পরম আদরে ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদান করাতেন। তার এই অকাল মৃত্যুতে ছাত্র-ছাত্রীরা একজন মা হারালো।
সিরাজগঞ্জ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) মো. ফরিদুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় স্কুল শিক্ষিকাসহ তার এক ছেলে ও মেয়ে মারা গেছে। আহত রিকশা চালক চান মিয়া হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাহাউদ্দিন ফারুকী বলেন, চশমা মেরামতের জন্য নিহত স্কুল শিক্ষিকা ও তার ছেলেমেয়ে নিয়ে অটোরিকশায় যাওয়ার পথে শহরের কালাচান মোড় এলাকায় পৌছলে একটি যাত্রীবাহী বাস সামনের একটি ট্রাককে ওভারটেক করলে বাসটি অটো রিকশাকে চাপা দিলে ওই স্কুল শিক্ষিকাসহ তার ছেলেমেয়ের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ওই পরিবার থেকে কোন মামলা করা হয়নি। তবে বেপরোয়া বাসটি থানায় জব্দ করে রাখা হয়েছে। বাসের চালক ও হেলপারকে ঘটনাস্থলে পৌছে পাওয়া যায়নি।
এম এ মালেক/বার্তাবাজার/এসজে