অপরাধ জগতের মহারাজ যেন সমালোচনার তুঙ্গে এক সময়ের নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য, দিনমজুর, ভ্যানচালক, ছিঁচকে চোর, বাসের হেলপার পরে বিএনপির ক্যাডার থেকে আ.লীগে অনুপ্রবেশকারী নবীদুল ইসলাম। তিনি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়ন আ.লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান। এক দশকে অবৈধ উপায়ে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তিনি।
চাঁদাবাজি, অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগ বাণিজ্য, বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা তছরুপ, মাদক চোরাচালান, যমুনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষের জায়গা দখল করে পশ্চিমপাড়ে গাড়ি লোড-আনলোড ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও পুকুর দখলের মাধ্যমে তিনি এত অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন বলে ইউনিয়ন আ.লীগের তৃণমূলের নির্যাতিত নেতাকর্মীসহ স্থানীয়দের অভিযোগ। এ ছাড়া তার কথামতো না চলায় তিনি নিজ দলের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মারধর ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেন। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা বেলাল হোসেন হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান আসামিও ছিলেন তিনি।
আরেক জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুল হত্যা মামলার মূল পরিকল্পনাকারী বলেও অভিযোগ তাদের। কুখ্যাত খুনি এরশাদ সিকদারের নাম শুনলে লোকে ভয়ে-ঘৃণায় আঁতকে উঠলেও অর্থ ও পেশিশক্তির দাপটে তিনি এখন এলাকায় নিজেকে সেই ‘এরশাদ শিকদার’ বলে দাবি করছেন।
ইদানীং তিনি ইউনিয়নের সীমানা পেরিয়ে শহরেও তার প্রভাব বলয় বিস্তারের পাঁয়তারা করছেন। প্রতিদিনই নিজস্ব মাইক্রোতে ক্যাডার বাহিনী নিয়ে শহরের মোড়ে মোড়ে মহড়া দিয়ে থাকেন। বর্তমানে তার নামে অস্ত্রসহ সাতটি মামলা রয়েছে। সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নবীদুল সয়দাবাদ ইউনিয়নের মুলিবাড়ি গ্রামের মৃত কৃষক দেলোয়ার হোসেন ওরফে ন্যাংটা দেলার সাত সন্তানের মধ্যে ষষ্ঠ। পৈতৃক জমিজমা ছিল দুই বিঘার মতো। কোনোমতে চলত তাদের সংসার। মাত্র ১৫ বছর বয়সে নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে গড়ে ওঠে নবীদুলের সখ্য। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের কোনাবাড়ি শহীদুল বুলবুল কলেজ মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করেন।
২০০১ সালের ২ জুন জনপ্রিয় ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আ.লীগের সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা বেলাল হোসেনকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নবীদুল ও তার বড়ভাই আব্দুর মোমিন ওই হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন। ওই মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জেলহাজতে ছিলেন এক-দেড় বছর। পরবর্তীতে সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে তিনিসহ মামলার সব আসামি খালাস পেয়ে যান। সক্রিয় হয়ে ওঠেন বিএনপির রাজনীতিতে। এ সময় অভাবের তাড়নায় ছিঁচকে চুরিসহ ছোটখাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পতন আন্দোলন শুরু হলে নবীদুলের নেতৃত্বে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়। আ.লীগের শত শত নেতাকর্মী হয়ে পড়েন বাড়িছাড়া। ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত অভি এন্টারপ্রাইজের বাসে হেলপারি করেন। ২০০৯ সালে অনুপ্রবেশ করেন আ.লীগের রাজনীতিতে। ২০১১ সালে ৫নং ওয়ার্ড যুবলীগের সম্পাদক ও ২০১৪ সালে ইউনিয়ন আ.লীগের সম্পাদকের পদ পান। ২০১৬ সালে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের সম্মেলনে আবারও সম্পাদক হন নবীদুল।
এভাবে প্রায় এক দশকে অবৈধ অর্থ ও পেশিশক্তি বলে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে হয়ে ওঠেন প্রায় শতকোটি টাকার মালিক। ইতোমধ্যে তিনি ট্রাক কিনেছেন প্রায় ২০টি। নিজে ব্যবহার করেন ৩৫ লাখ টাকা মূল্যের মাইক্রো। মহাসড়কের পাশে মুলিবাড়ি এলাকায় ১৫ ও ৪.২০ শতক জায়গা কিনে সেখানে নির্মাণ করছেন দুটি বিলাসবহুল পাঁচতলা ভবন। একই এলাকায় বাড়ি করার জন্য জমি কিনেছেন ২০ শতক।
পৈতৃক ভিটার পাশে ১৬ শতক জায়গা কিনে সেখানেও নির্মাণ করেছেন আরেকটি দ্বিতল ভবন। নবীদুল চেয়ারম্যান সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করতে প্রতিপক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। এত অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার পেছনের কারণ হিসাবে তিনি বলেন, আমার কয়েকটি ট্রাক রয়েছে। পাথর, ইট, বালুসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল সরবরাহের কাজ করি। একটি গরুর ফার্মও রয়েছে।
এসব ব্যবসার মাধ্যমেই টাকা উপার্জন করেছি। আয়কর ফাইলে সব তথ্য দেওয়া আছে। এ ছাড়া বেলাল চেয়ারম্যান হত্যা মামলায় আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। ওই মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে এক-দেড় বছর জেলে ছিলাম। সাইফুল হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত ছিলাম না। এ ছাড়া তিনি স্থাবর সম্পত্তির কথা স্বীকার করলেও তার নামে কোনো মামলা নেই বলে জানান। তবে সদর থানার ওসি বাহাউদ্দিন ফারুকী জানান, নবীদুলের নামে ছয়টি মামলা বিচারাধীন ও একটি মামলার তদন্ত চলছে।
এম এ মালেক/বার্তাবাজার/পি