রাজধানীর উত্তরার আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী সেলিম মোল্লাকে শনিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাত ৮ টার দিকে গ্রেফতার করেছে তুরাগ থানা পুলিশ। তুরাগের পাকুরিয়া নামক স্থান থেকে ৯৩পিস ইয়াবাসহ তাকে আটক করা হয়। তুরাগ থানার চৌকস অফিসার এসআই শাহীন তার সঙ্গীয় ফোর্সসহ তাকে আটক করার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
মাদক ব্যবসা, নারী কেলেঙ্কারি, অর্থ আত্মসাৎ ও ধারের নামে টাকা নিয়ে অভিনব প্রতারণা করা সেলিম মোল্লাকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হয়েছিল। কিন্তু তারপরও বীরদর্পে ঘুরে বেড়ানো এই ত্রাসকে গ্রেফতারের খবরে স্বস্তি ফিরে এসেছে সাধারণের মাঝে।
খবরে প্রকাশ, তুরাগের নলভোগ এলাকায় বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের টার্গেট করে টাকা ধার নেয়া বা জমিজমা ক্রয় সূত্রে বন্ধুত্ব স্হাপন করে তারপর টাকা ধার নেয়া, এক পর্যায়ে পাওনাদাররা টাকা ফেরত চাইলে তালবাহানা, অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও হুমকি ধামকির অভিযোগ মাদকব্যবসায়ী মোঃ সেলিম মোল্লা (৩৮)। তার পিতার নাম শফি উদ্দিন মোল্লা।
গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে হওয়ায় রাজনৈতিক পরিচয়ে ক্ষমতাসীনদের নাম ব্যবহার করে সেলিম মোল্লা এরকম অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে সেলিম মোল্লার নামে নানান ভয়ঙ্কর তথ্য ও উপাত্ত। সেলিম মোল্লা উত্তরাবাসীর কাছে এখন একটি ভীতির নাম।
নিজের কুচরিত্র, অর্থ আত্মসাৎ ও লালসার স্বীকার হওয়া এক তরুণী আজও ভুলতে পারেন না সেলিম মোল্লার মোল্লার ভয়ঙ্কর চেহারা। তাইতো নিজের ধর্ষণ হওয়া ও সেলিম মোল্লার অর্থ আত্মসাৎ এর বিচার চাইতে ঘুরেছিলেন তুরাগ থানার দ্বারে। শেষে লিখিত অভিযোগ ও ভিডিও ফুটেজ তুলে দেন সাংবাদিকদের হাতে। এরকম অনেক প্রতারণার সত্যতাও চলে এসেছে এই প্রতিবেদকের হাতে। যা শুধু উত্তরাবাসীকে নয় বরং দেশের শীর্ষ স্থানীয় রাজনীতিবিদদেরও ভাবিয়ে তোলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সেলিম মোল্লা তুরাগের নলভোগ এলাকায় জায়গা কিনে অত্র জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করার সময় নির্মাণ শ্রমিকদের মজুরি প্রদান না করেই অসহায় শ্রমিকদের নানা হুমকি ধামকি দিয়ে বিতাড়িত করেছে।
এ বিষয়ে সেকেন্দার (০১৭২২******) নামের এক নির্মাণ শ্রমিক জানায়, নলভোগের পুকুরপাড়ের হাজি বাড়ীর মোড় এলাকায় সেলিম মোল্লা আমাদেরকে দিয়ে কাজ করায়। আমি ৬০ হাজার টাকা পাই। কাজ শেষে আমরা তার কাছে মজুরী চাইলে তিনি আমাকেসহ আরও ১০/১২ জন শ্রমিকের মজুরী দেয়ার নামকরে দীর্ঘদিন ঘুরাতে থাকে। আমরা আমাদের পারিশ্রমিক চাইলে সে নিজেকে গোপালগঞ্জের লোক বলে আমাদেরকে ভয়ভীতি দেখায়। ফলে সেলিম মোল্লার কাছ থেকে এখনও আমরা সেই টাকা পাইনি।
বয়স্ক এক দিনমজুর জানান- আমি টাকার অভাবে ঘরভাড়া দিতে পারনি..। বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন তিনি। এরকম প্রতারিত বেশ কয়েকজন সরাসরি ভিডিওতে সাক্ষাৎ দেন। সকলেই সেলিম মোল্লার দ্বারা প্রতারিত।
কেরামত (৩৮) নামের একজন ভুক্তভোগী জানান- আমার নগদ ১২লক্ষ টাকা ধার বাবদ নিয়ে আজো পরিশোধ করেনি সেলিম মোল্লা। সামান্য কিছু টাকা লাভ বাবদ দিলেও আমি টাকার জন্য ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে যাই। তার নাকি রাজনৈতিক নেতা পকেটে থাকে। আমাকে হুমকি দেন। আমিও মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর জেলার লোক বলে পরিচয় অতঃপর প্রভাব খাটিয়ে চলা এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। সর্বশেষ গত ১ ২সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং তারিখে মোঃ সেলিম মোল্লার বিরুদ্ধে রাজধানীর তুরাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছে নলভোগের এক স্থানীয় বাসিন্দা (০১৭৮৯****২০)। এই ভুক্তভোগীর নাম সেলিম মিয়া। তুরাগ থানাধীন কফিল উদ্দিন মেম্বারের ছেলে।
সেলিম মোল্লা তুরাগের নলভোগ এলাকায় জমি ক্রয় সূত্রে ও বাসা নির্মাণ প্রসঙ্গে সেলিম মিয়ার কাছ থেকে বাকীতে রড, সিমেন্টসহ গৃহ নির্মাণ সামগ্রী ক্রয় করেন যার মূল্য ২৩ লক্ষ ৪৯ হাজার এবং জমি ক্রয়ের সময় ৫০ লক্ষ টাকার চেক প্রদান পূর্বক নগদ টাকা ধার নেন বলে অভিযোগ করেন সেলিম মিয়া। যার প্রেক্ষিতে তুরাগ থানায় একটি জিডি করেন, যার নং- ৫৭৭। এই পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে এখন দুজনের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজমান। নিজের প্রায় ৭৩লক্ষ টাকা না পাওয়ার চিন্তিত এই ব্যবসায়ী আজ পথে বসেছে।
সেলিম মিয়া নামের এই ভুক্তভোগী জানান, সেলিম মোল্লা তার পূর্ব পরিচিত হওয়ায় নিজেদের মধ্যে ব্যবসায়িক লেনদেন সংগঠিত হয়। ব্যবসায়িক লেনদেনের এক পর্যায়ে সেলিম মোল্লাকে নগদ ধার প্রদান করা পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ও নিজ গৃহ নির্মাণ সামগ্রী প্রতিষ্ঠান হতে বাকীতে পণ্য বাবদ তেইশ লক্ষ ঊনপঞ্চাশ হাজার টাকা পাওনা রয়ে যায়। পাওনা টাকা ফেরত চাইলে সেলিম মোল্লা আমাকে ডাচ বাংলা ব্যাংকের একটি চেক ধরিয়ে দেয়। চেক পেয়ে ব্যাংকে গিয়ে জানতে পারি ব্যাংকে তার কোন টাকা নাই। আমি সন্দেহ পোষণ করছি সেলিম মোল্লা নামের এই মানুষরূপী প্রতারক আমাকে ভুয়া চেক ধরিয়ে দিলো কি-না? পরবর্তীতে আমি তার কাছে পাওনা টাকা ফেরত চাইলে ওই ব্যক্তিকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে। সেলিম মোল্লা নামের এই প্রতারক টাকা চাইতে গেলে আমার নামে মামলা করবে বলে হুমকি দেয়।
শেষে আমি বাধ্য হয়ে এর প্রেক্ষিতে তুরাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৫৭৭, তারিখ- ১২/০৯/২০২০ ইং) করি। বিজ্ঞ আদালতে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে তিনি আরো জানান। তিনি বলেন- সেলিম মোল্লার অভিনব প্রতারণায় আজ আমি নিঃস্ব। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নিকট বিচার চাই, এই প্রতারকের বিরূদ্ধে।
রত্না বেগম (ছদ্মনাম) তিনি লিখিত অভিযোগ করেন সেলিম মোল্লা প্রেমের সূত্র ধরে তার গচ্ছিত ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও দেড় ভেরি ওজনের স্বর্ণের চেইন হাতিয়ে নেন। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আমাকে তার অফিসে নিয়ে ধর্ষণ করেন। এভাবে বহুবার শারীরিক সম্পর্ক স্হাপন করেন। আমি তুরাগ থানায় মামলা করতে গেলে করোনা সংক্রান্ত কারণে মামলা নেয়া হয়নি। আমি এবার কোর্টে মামলা করবো। আমি একজন অসহায় মেয়ে। আমার সম্ভ্রমহানি করা সেলিম মোল্লার বিচার আমার কাম্য। তিনি ভিডিও বার্তায় সেলিম মোল্লার বিরূদ্ধে সকল অপকর্মের বিশদ বর্ণনা করেন।
তুরাগ থানার এসআই মনিরুল ইসলাম যার হাতে রয়েছে উভয়পক্ষের জিডি তিনি মুঠোফোনে জানান, আপাতত আমার তদন্তে সেলিম মিয়া সঠিক। সেলিম মিয়া টাকা পাবে সেলিম মোল্লার কাছে। উভয়পক্ষ কোর্টে মামলা দায়ের করেছে। বিজ্ঞ আদালতে এর সুষ্ঠু বিচার হোক।
অপরদিকে, সেলিম মোল্লাকে এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বারবার অস্বীকার করেন সকল অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ দেন সেলিম মিয়ার বিরূদ্ধে। কিন্তু তিনি বিশেষ কোন প্রমাণ তুলে ধরতে পারেন নাই। তিনি কোর্টে মামলা করেছেন বলে জানান।
উত্তরা বাসীর আতঙ্ক, অভিযুক্ত প্রতারক সেলিম মোল্লার ভয়ে নিরীহ মানুষ ভয়ে কথা বলতে সাহস পায় না। নিজেকে গোপালগঞ্জের পরিচয়দানকারী এই অভিনব প্রতারকের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস উঠিয়ে ফেলবে রাজনৈতিক নেতাদের উপর। কার ইন্ধনে, কার ইশারায় এই সেলিম মোল্লার বাহাদুরি ও ঠকবাজি তা খুঁজে বের করে শাস্তি দাবী এলাকাবাসীর। অনতিবিলম্বে সেলিম মোল্লার বিচার দাবী বিজ্ঞ মহলের।।
বার্তাবাজার/এসজে