বুক ভরা একরাশ স্বপ্ন, রঙিন বেলুনেও হাসি নেই বায়েজিত’র মুখে

জীবিকার চাকা চলমান রাখতে কেউ বড় কেউ বা ছোট্ট পরিসরে বিভিন্ন পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করছেন। আবার কেউ শুধুই জীবন
ধারনের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তবে এ কাজের জন্য কেই বড় হয়ে আবার কেউ ছোট্ট বেলাতেই বাস্তব জীবনের পথ পাড়ি দিতেই ধরছেন জীবন গাড়ির হ্যান্ডেল। এমনই এক জীবন সংগ্রামী শিশু বায়েজিত (১০)। যে বয়সে যার মা বাবার আদর ভালোবাসায় বেড়ে ওঠার কথা। ভালো স্কুলে পড়াশোনা করার কথা ও বিকেল হলেই খেলাধুলায় মেতে ওঠার কথা কিন্তু না তার জীবনের গল্পটা একটু আলাদা। সে এই বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে অনুভব করতে পেরেছে। সে শিখে গেছে কিভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়তই জীবনের সাথে লড়াই করতে হয়।

জীবন পরিচালনার জন্য এই ছোট্ট বয়সেই সে বেছে নিয়েছে বেলুন বিক্রির কাজ। লাল-নীল,হলুদসহ বাহারী রঙের ছোট ছোট বেলুনগুচ্ছ
বিক্রি করেই সংসারের হাল ধরছেন ছোট্ট এই শিশুটি। বেলুনে ভরা একরাশ স্বপ্ন থাকলেও মলিন মুখ যেন তার দিকে তাকালেই ভেসে ওঠে।
মঙ্গলবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সিরাজগঞ্জ শহরের শেখ রাসেল পার্কে গেলে দেখা মেলে বায়েজিত কতগুলো রঙিন বেলুন হাতে দাঁড়িয়ে আছে।

জানার আগ্রহ থেকে তার কাছে যেতেই সে তার পরিচিত গলায় বলতে লাগল, বেলুন লাগবে, ভাই, বেলুন। বায়েজিতের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে সে রাজি হল। কিন্তু বিনয়ের সাথে শর্ত জুড়ে দিল যে, ক্রেতা আসার আগেই কথা শেষ করতে হবে। গোলাপি, হলুদ, সবুজ, কমলা, নীল রঙের অনেকগুলো বেলুন। বেলুনের গায়ে সাদা বল বল ছাপ। বেলুনগুলো দশ বছরের শিশু বায়েজিত এর হাতে। তবে অন্য শিশুদের মতো বেলুন হাতে থাকলেও বায়েজিতের মুখে হাসি নেই। ক্লান্তির ছাপ চোখেমুখে। এক হাতে মুঠো করে এবং আরেক হাতে বেলুনগুলোর ভার বইতে তার কষ্ট হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ শেখ রাসেল পার্কে ঢুকতেইও এগিয়ে যায় বেলুন বিক্রিকরতে। তবে বেশির ভাগ সময়ই তাকে নিরাশ হতে হচ্ছে। একেকটা
বেলুনের দাম ১০ টাকা। রাসেল পার্কে বসেই কথা হয় বায়েজিতের সঙ্গে। বেলা তখন ৫ টা। এদিকে শীতের তেজও বেশ ঘনিয়ে আসছে।
যমুনা পাড়ের ঠান্ডা হাওয়ায় রাস্তায় দৌড়ে বেড়ানো বায়েজিত এর গায়ে শীতের তেমন কোন পোশাক ও নেই। পড়নে একটি শাট ও প্যান্ট।
বায়েজিত এর মা ঢাকা গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করেন। বাবা কী করেন এমন প্রশ্নের উত্তরে ছোট করে বললো, বাবা পাথরের কাজ করে।
তুমি পড়াশোনা বাদ দিয়ে এগুলো করো কেন? এ প্রশ্নে তার মুখে কোনো কথা নেই। এবারও নিশ্চুপ। শুধু মলিন মুখটি আরেকটু মলিন
হলো। একটু পর বললো মা টাকার জন্য ঢাকায় থাকে তাই আমি বাড়িতে থেকেই বেলুন বেচে একটু সহযোগিতা করি সংসারে। তবে আমি
শুধু স্কুল বন্ধ দিলে বেলুন নিয়ে বের হই। দেশে করোনা রোগ আইছে তাই স্কুল আর খোলেনা তাই এগুলা করি। আমি দিনে সর্বোচ্চ ৫০ টি বেলুন বিক্রি করতে পেরেছি। আমার এ কাজে বাবা খুব খুশি হন।

কথাগুলো বলছিলেন রঙিন বেলুন বিক্রেতা সিরাজগঞ্জ পৌরসভার একডালা (পূনর্বাসন) এলাকার ও কাওয়াখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের
তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র মো. বায়েজিত (১০)। তার বাবা সেলিম শেখ, পেশায় শ্রমজীবী। যমুনা নদীর হার্ড পয়েন্ট ও রাসেল পার্কে ফেরি করে
বেলুন বিক্রি করে এ শিশুটি। মহামারি করোনার ছুটিতে অন্য শিশুরা যখন বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরতে বের হয়, নানান জিনিস কিনে দিতে
বায়না ধরে, সে সময় কতগুলো রঙিন বেলুন হাতে বিক্রির জন্য রাস্তায় বের হয়েছে স্কুল ছাত্র বায়েজিত। তার চোখেমুখে কোন বিরক্তি নেই,
একটি বেলুন বিক্রি করতে পারলেই যেন তার তৃপ্তি মেলে। পরে মোবাইল ফোনে কথা হয় সংগ্রামী শিশুটির মা মোছাঃ মমতা খাতুনের সাথে এ
সময় তিনি বলেন, অভাবের সংসার কি আর করমু কন, ছেলেটাকে ওর নানীর কাছে রাখি। আমাদের তো সরকার কিছু দেয় না। এদিকে ভিক্ষা
তো আর করতে পাড়ি না সেই কাজ করেই চলতে হয় আংগরে। ওর নানি সাথে করে নিয়ে বেলুন বেচে। এতে কিছু হয়।

কথা বলে জানা যায়, করোনার কারনে স্কুল ছুটি হয়েছে। এ জন্যই সে বেলুন বিক্রি করতে বের হয়েছে। স্কুল বন্ধ থাকলে প্রায়ই এ কাজটি করে। মূলত এটি করে তার বাবাকে আর্থিক সহযোগীতা করে। তবে তাকে জোর করে এ কাজে পাঠানো হয়নি। বাবাকে সহযোগিতা করতেই
বেলুন নিয়ে রাস্তায় বের হয়েছে বায়েজিত। শুধু মাত্র যমুনার হার্ড পয়েন্ট ও রাসেল পার্ক এলাকায় সে বেলুন বিক্রি করে থাকে। তাদের কোন
স্থায়ী দোকান নেই। প্রতিদিনই গ্যাস দিয়ে ৪০-৫০টি বেলুন ফুলিয়ে সেগুলো বিক্রির জন্য ঘর থেকে বের হয় বায়েজিত। যমুনার কোলঘেষে
বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে এসব বেলুন বিক্রি করে থাকেন। দিনে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টি বেলুন বিক্রি করতে পারে। আবার মাঝে মাঝে আরো
কমও বিক্রি হয়। নানা রঙের বেলুনগুলো দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। খুব সহজেই এসব শিশুদের মনকে আকৃষ্ট করে। বাচ্চাদের জন্য কিনে নিয়ে
যান বাবা-মা। যে শিশুদের জন্য এ বেলুন সে বেলুনের বিক্রেতাও একজন শিশু। ছেলেরা সবসময় তাদের বাবাকে কোনো না কোনো কাজে
সহযোগিতা করতে চায়। হয়তো প্রাপ্তবয়স্ক হলে এটি বেশি দেখা যায়। তবে ভিন্ন রকম অনুভূতির সৃষ্টি হয় স্কুলছাত্র বায়েজিতকে দেখে। মাত্র
১০ বছর বয়সে সে অভাবের সংসারকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছে।

এম এ মালেক/বার্তাবাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর