জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিভাগেই রহস্যজনক কারণে অধ্যাপক নিয়োগ হচ্ছে না বছরের পর বছর।বিশ্ববিদ্যালয়টির ৩৬ বিভাগের মধ্যে ১১ বিভাগেই অধ্যাপক নিয়োগ নিয়ে গড়িমসি। এরমধ্যে ৩ টি বিভাগ সম্পূর্ণ অধ্যাপক শূন্য ও ৮ বিভাগে অধ্যাপক আছেন ১ জন করে।
একাধিক অধ্যাপক না থাকায় অনেক বিভাগেই অধ্যাপকের সেচ্ছাচারিতার অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বছরের পর বছর ধরে রাখছেন বিভাগীয় প্রধান ও ডীন পদ। এছাড়াও নানাবিধি অনিয়মের অভিযোগতো আছেই।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধ্যাপক শূণ্য রয়েছে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগ, সঙ্গীত বিভাগ ও
নাট্যকলা বিভাগ। এছাড়াও এক জন করে অধ্যাপক দিয়ে চলছে, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং,
প্রাণরসায়ন ও অনুজীব বিজ্ঞান, ফার্মেসি, আইন, ফ্লিম টেলিভিশন, লোকপ্রশাসন, সাংবাদিকতা ও
ইসলামের ইতিহাস বিভাগ।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন (২০০৫) এর ‘২৪ নং ধারার ২ নং উপধারায়’ বলা আছে, ‘বিভাগীয় অধ্যাপকদের মধ্য হইতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পালাক্রমে তিন বৎসর মেয়াদে ভাইস-চ্যান্সেলর কর্তৃক বিভাগীয় চেয়ারম্যান নিযুক্ত হইবেন। ২৪ নং ধারার ৩নং উপধারায় বলা আছে, যদি কেন বিভাগে অধ্যাপক না থাকেন তাহা হইলে ভাইস-চ্যান্সেলর সহযোগী অধ্যাপকদের মধ্য হইতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পালাক্রমে একজনকে বিভাগীয় চেয়ারম্যান নিযুক্ত করিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, সহযোগী অধ্যাপকের নিম্নের কোন শিক্ষককে বিভাগীয় চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত করা যাইবে না। আরো শর্ত থাকে যে, অন্যুন সহযোগী অধ্যাপক পদমর্যাদার কোন শিক্ষক কোন বিভাগে কর্মরত না থাকিলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রবীনতম শিক্ষক উহার চেয়ারম্যান হইবেন।’
ডিন হিসেবে নিযুক্তির ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন (২০০৫) এর ২২ নং ধারার ৫ নং উপধারায় বলা আছে, ‘ভাইস-চ্যান্সেলর সিন্ডিকেটের অনুমোদনক্রমে প্রত্যেক অনুষদের জন্য উহার বিভিন্ন বিভাগের অধ্যাপকদের মধ্য হইতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পালাক্রমে দুই বৎসর মেয়াদের জন্য ডিন নিযুক্ত করিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, কোন ডিন পরপর দুই মেয়াদের জন্য নিযুক্ত হইতে পারিবেন না। আরো শর্ত থাকে যে, কোন বিভাগে অধ্যাপক না থাকিলে সেই বিভাগের জ্যেষ্ঠতম সহযোগী অধ্যাপক ডিন পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হইবেন এবং কোন বিভাগের একজন অধ্যাপক ডিনের দায়িত্ব পালন করিয়া থাকিলে ঐ বিভাগের পরবর্তী পালাসমূহে অবশিষ্ট অধ্যাপকগন জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ডিন পদে নিযুক্তির সুযোগ পাইবেন। আরো শর্ত থাকে যে, একাধিক বিভাগে সমজ্যেষ্ঠ অধ্যাপক অথবা সহযোগী অধ্যাপক থাকিলে সেক্ষেত্রে তাহাদের মধ্যে ডিন পদের আবর্তনক্রম ভাইস-চ্যান্সেলর কর্তৃক নিদিষ্ট হইবে।’
আইন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আলী আক্কাস সরকার আইন ভঙ্গ করে পর পর চারবার ডীন হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। সরকার আলী আক্কাস ২০১২ সালের ৯ মে থেকে ২০১৮ সালের ৮ মে পর্যন্ত ডিনের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে চতুর্থবার তাকে পুনরায় নিয়োগ দিলে ভুমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক খ্রীষ্টিন রিচার্ডসন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরেন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন খ্রীষ্টিন রিচার্ডসনকে আইন অনুষদের ডীন হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০২০ সালের ১৫ জুন খ্রীষ্টিন রিচার্ডসনের মেয়াদ শেষ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের দুই বিভাগে আরও তিনজন সহযোগী অধ্যাপক থাকার পরেও নিয়ম অনুযায়ী তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ না দিয়ে সরকার আলী আক্কাসকে আবারও চতুর্থবারের মতো ডীন হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসেবে সরকার আলী আক্কাস ২০০৯ সালের ১ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই বর্তমান সময় পর্যন্ত একাধারে ১১ বছর যাবৎ দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে আইন বিভাগে দুইজন সহযোগী অধ্যাপক আছে কিন্তু তাদের মধ্য থেকে কাউকেই এখন পর্যন্ত পালাক্রমের ভিত্তিতে চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়নি।
ফার্মেসি বিভাগে প্রায় ১০ বছর ধরে বিভাগীয় প্রধান রয়েছেন বিভাগের একমাত্র অধ্যাপক ড. এ.জেড.এম রুহুল মোমেন। তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের উপর উপুর্যপরি জরিমানা চাপানোর অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম উপেক্ষা করে ভর্তি বা সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত টাকা গ্রহণের অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
ফ্লিম এন্ড টেলিভিশন বিভাগে প্রায় ৫ বছর ধরে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে রয়েছেন অধ্যাপক জুনায়েদ আহম্মদ হালিম। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে প্রায়দিনই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়মিত থাকেন তিনি। এছাড়াও তার ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়ে এক শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। ওই শিক্ষার্থীর ক্লাস, পরীক্ষা নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, প্রক্টরের অনুমতিও আমলে নিচ্ছেন না তিনি। পরীক্ষায় বসতে গেলে ছাত্রলীগ দিয়ে মার খাওয়ানো ও একাডেমিক কার্যক্রম চালাতে না দেয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে ঐশিক্ষার্থীকে।
২০১০ সালে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের তৎকালিন বিভাগীয় প্রধান জাহানারা বেগমের মৃত্যুর পর থেকে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে আছেন অধ্যাপক ড. আতিয়ার রহমান। প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি চেয়ার ধরে থাকলেও সুযোগ পাচ্ছেন না অন্যান্য শিক্ষকরা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, কোন কাজে স্বাক্ষর নিতে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিভাগের একাউন্টে জমা দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। টাকা জমার রশিদ না দেখালে স্বাক্ষর মেলে না। সম্প্রতি বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের এক শিক্ষার্থী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে সাবেক এক শিক্ষার্থীকে দিয়ে তাকে পিটিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়া করানোর হুমকিও দেয়ারও অভিযোগ ওঠে।
এছাড়াও প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রায় ৭ বছর ধরে বিভাগীয় প্রধান আছেন লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসমা বিনতে ইকবাল। ৩ বছরের ১ম মেয়াদ শেষে প্রায় ৪ বছর ধরে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে রয়েছেন প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. লাইসা আহমদ লিসা।
এবিষয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী ওহিদুজ্জামান বলেন, অধ্যাপক পদে নিয়োগের জন্য আমরা যোগ্য কাউকে পাচ্ছি না তাই অধ্যাপক নিয়োগ হচ্ছে না, প্রমোশনও হচ্ছে না।
একই পদে দীর্ঘদিন ধরে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ” বিশেষ বিবেচনায় তারা রয়েছেন।”
বার্তাবাজার/পি