পেটে ছুরিকাঘাতের পর ওই ভোট কেন্দ্রেই লুটিয়ে পড়েছিলেন বিজয়ী কাউন্সিলর তরিকুল। মাটিতে রক্ত লেগে থাকা মলিন ওই ধূলোর মতোই অনেকটা হতাশা গ্রাস করেছে পরিবারকে। কিন্তু হাল ছাড়তে রাজি নন কেউই। দ্বিতীয় দফার পৌর নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের শহীদগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার পর পরই পরাজিত প্রার্থীর ছুরিকাঘাতে খুন হন বিজয়ী প্রার্থী তরিকুল ইসলাম খান।
অভিশপ্ত ওই রক্তমাখা প্রাণনাশের বিজয়ই যেন তাদের পরিবারের গলায় পরাজয়ের মালা পড়িয়েছে। এখন হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও সর্ব্বোচ্চ শাস্তির প্রত্যাশায় প্রহর গুনছে পরিবারটি।
অপরদিকে, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার ও সুবিচার নিশ্চিত করা হবে বলে আশস্ত করেছেন রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি টিএম মোজাহিদুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ ও পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম(বিপিএম)।
এদিকে, ১৭ জানুয়ারি রবিবার নিহত তরিকুল ইসলাম খানের ছেলে একরামুল হাসান হৃদয় বাদি হয়ে পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী সাহেদনগর ব্যাপারীপাড়া মহল্লার বাসিন্দা ও ৬নং ওয়ার্ড আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদৎ হোসেন বুদ্দিনকে প্রধান আসামী করে ৩২জনের নাম উল্লেখপূর্বক অজ্ঞাত ৪০/৫০ জনের নামে একটি মামলা দায়ের করেন। ঘটনার রাতেই মামলার ২৭নং আসামি স্বপন ব্যাপারীকে শহরের একটি বাড়ি থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়।
এলাকার সচেতন মহল বলছেন, হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের বিষয়ে প্রশাসনের দেয়া আশ্বাসের উপর আস্থা রেখে কোন কর্মসূচিতে যায়নি এলাকাবাসী। অথচ হত্যাকান্ডের পর পাঁচদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো অধরা রয়েছেন মামলার প্রধান আসামী ৬নং ওয়ার্ড আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদৎ হোসেন বুদ্দিনসহ অন্য আসামীরা। এতে দিন দিন হতাশা বাড়ছে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডসহ শহরবাসীর মধ্যে। যতদ্রুত সম্ভব দোষীদের গ্রেফতার করে সর্ব্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তারা।
নিহত তরিকুলের বাড়িতে বুধবার সন্ধ্যার পর গিয়ে দেখা যায়, স্ত্রী হাসি খাতুনের কান্না যেন থামছেই না। বাকরুদ্ধ ছেলে একরামুল হাসান হৃদয় ও মেয়ে তাহিদা জাহান তিজা। শান্তনা দেয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন স্বজনরা।
এসময় খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার করে ফাঁসি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে হাসি খাতুন বার্তা বাজারকে বলেন, আমার স্বামীর উপার্জনেই সংসার চলতো। ছেলে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করছে। ব্যাংক থেকে লোন করে বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে। এখন এসব দেখবে কে?
নতুন ভাঙ্গাবাড়ি মহল্লার বাসিন্দা ও জেলা আ’লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন জুয়েল বার্তা বাজারকে বলেন, শাহাদৎ হোসেন বুদ্দিন গত তিনটি পৌর নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী হলেও প্রতিবারই নতুন ভাঙ্গাবাড়ি মহল্লার প্রার্থীর কাছে হেরে যান। তিনি কোনবারই জনগণের রায় মেনে নিতে পারেননি। ২০১৬ সালের পৌর নির্বাচনে বুদ্দিন নতুন ভাঙ্গাবাড়ি মহল্লার শাহাদৎ হোসেনের কাছে হেরে যান। পরদিন বুদ্দিনের নেতৃত্বে আমার উপর হামলা করা হয়। তারা আমাকে কুপিয়ে শরীরে ২২টি স্থানে ক্ষতের সৃষ্টি করে। এর আগের নির্বাচনে আমাদের মহল্লারই আরেক প্রার্থী রাশেদুল হাসান ফসির কাছে হেরে গিয়ে হামলা করে এবারের নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী ও নিহত তরিকুলের উপর। এসব হামলায় তখন আমরা প্রাণে বেঁচে গেলেও এবার তরিকুলকে ছুরিকাঘাত করে মেরেই ফেলা হলো।
পৌর আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক দানিউল হক মোল্লা বার্তা বাজারকে জানান, নিহত তরিকুলের জানাযা নামাজের পূর্বে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পৌর আ.লীগের সভাপতি হেলাল উদ্দিন অভিযুক্ত ৬নং ওয়ার্ড আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদৎ হোসেন বুদ্দিনকে দল থেকে বহিস্কারের ঘোষণা দেন। এটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আ.লীগে কোন অপরাধীর স্থান নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা আ.লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ তালুকদার বার্তা বাজারকে বলেন, তরিকুল হত্যাকান্ডের বিষয়টি রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। আমরা আশা করবো এ হত্যাকান্ডের সাথে যারাই জড়িত থাকনা কেন তাদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবেন তারা।
এব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই তরিকুল ইসলাম বার্তা বাজারকে বলেন, আসামীদের গ্রেফতারে যথাসাধ্য চেষ্টা চলছে। দ্রুতই ভালো ফল পাওয়া যাবে বলে তিনি আশ্বাস্ত করেন।
পুলিশ সুপার মো. হাসিবুল আলম(বিপিএম) বার্তা বাজারকে বলেন, পুলিশের ৩/৪টি টিম কাজ করছে। আশা করি ২/১দিনের মধ্যে ভালো কোন খবর দিতে পারবো।
উল্লেখ্য, ১৬ জানুয়ারি শনিবার দ্বিতীয় দফায় অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনের দিন সন্ধ্যার পর সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডের শহীদগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নিহত তরিকুলের প্রতিদ্বন্দ্বী শাহাদৎ হোসেন বুদ্দিন তার সমর্থকদের নিয়ে ভোটের ফল প্রকাশে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এমন খবরেরভিত্তিতে তরিকুল ওই কেন্দ্রে হাজির হন। এরই এক পর্যায়ে কেন্দ্রে ফলাফল প্রকাশ করা হলে ডালিম প্রতীকের প্রার্থী তরিকুল ইসলাম খান বেসরকারিভাবে ৮৪ ভোটে নির্বাচিত হন। এসময় আগে থেকে অবস্থান নেয়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বুদ্দিন তার পরাজয় সইতে না পেরে তৎক্ষনাত ধারালো অস্ত্র দিয়ে তরিকুলের পেটে আঘাত করে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা তাকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে সিরাজগঞ্জ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
বার্তাবাজার/এ.আর