করোনায় বন্ধ কিশোর-কিশোরী ক্লাব, ফিরতে ব্যাকুল শিক্ষার্থীরা

হাওরাঞ্চল। আধুনিক নগর জীবনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারা এক জনপদ। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, নগরের সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত এ জনপদে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্ন। শহরের তরুণীদের সাথে প্রতিযোগিতায় অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকে হাওরাঞ্চলের মেয়েরা। এ জনপদে দারিদ্রতা কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে মেয়েদের কম বয়সে বিয়েটা পরিবারে অভিভাবক স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিচ্ছে।

এর বাইরে স্কুলে মেয়েদের অংশগ্রহণ আশানুরূপ হলেও কলেজের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারে কম সংখ্যক মেয়েরা। এমন বাস্তবতায় মেয়েদের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। প্রয়োজন নিজের কথা বলতে পারার আত্মবিশ্বাস অর্জনের ক্ষমতা। প্রয়োজন যুক্তি আর কর্ম দিয়ে সমাজের দৃষ্টি ভঙ্গি বদলে দেয়ার ক্ষমতা। এজন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ কিংবা সংঘবদ্ধ প্রচারণা।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিশেষ করে নারীসমাজকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে এবং পিছিয়ে থাকা পরিবারের কিশোর-কিশোরীদের জীবনমান উন্নয়ন ও জেন্ডার বৈষম্যের শিকার কিশোরীদের সমাজের উন্নয়নের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে চালু করা হয় কিশোর-কিশোরী ক্লাব।

সারাদেশের ন্যায় সুনামগঞ্জের তাহিরপুরেও চালু করা হয় এ ক্লাবের কার্যক্রম। যা হাওরাঞ্চলের কিশোর কিশোরীদের জন্য আশার আলো হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে বন্ধ হয়ে যায় ক্লাবের কার্যক্রম। কৈশোরের নানান প্রতিবন্ধকতা, চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম ফের কবে চালু হবে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ায় হতাশা আর মনঃকষ্টে ভুগছে উপজেলার কিশোর-কিশোরী ক্লাবের শিক্ষার্থীরা।

জানা গেছে, কৈশোরে যৌন নিপীড়ন, বাল্যবিবাহ, জেন্ডার বৈষম্য, যৌতুক প্রতিরোধ, শিশু অধিকার, নারী অধিকার ইত্যাদি বিষয়গুলোতে মেয়েরা নানান প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জের শিকার হয়। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পিছিয়ে পড়া পরিবারের কিশোর-কিশোরীরা এ সমস্যার মুখোমুখি হয় বেশি।

এসকল কিশোর-কিশোরীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবনমান বিকশিত ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ১টি করে কিশোর-কিশোরী ক্লাব চালু করে। প্রতিটি ক্লাবের ১১-১৮ বছর বয়সী সদস্য থাকবে ৩০ জন। এর মধ্যে ১০ জন কিশোর ও ২০ জন কিশোরী। সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার ক্লাস নেয়া হতো।

ক্লাসের কার্যক্রম একজন সঙ্গীত ও আবৃত্তি শিক্ষক এবং একজন জেন্ডার প্রমোটর এর মাধ্যমে পরিচালিত হতো। করোনার কারণে এসকল ক্লাবের কার্যক্রম শুরুর কিছুদিন পরই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে থমকে আছে কৈশোরের চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির এ কার্যক্রম।

উপজেলার মোট ৭টি ক্লাবের মধ্যে ৪টি ক্লাবের দায়িত্বে থাকা জেন্ডার প্রমোটর আলমাস নুর বলেন, কিশোর কিশোরীদের সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রমের শুরুতেই সাড়া পাওয়া গিয়েছিল বর্তমানে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে এখন তা বন্ধ আছে। আর জেন্ডার প্রমোটর পদে আমাদের চাকুরীটা ছিল চুক্তিভিত্তিক, ক্লাব বন্ধ থাকায় আমরাও বেতন পাচ্ছি না। অন্য কোন কাজও পাচ্ছি না সবমিলিয়ে পরিবার নিয়ে বিপাকে আছি। আপনাদের লেখার কল্যাণে যদি আমাদের বেতনের কোন উপায় হয় তবে অনেক উপকৃত হবো।

তাহিরপুর সদর, বড়দল উত্তর ও বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়নে ৩টি ক্লাবের দায়িত্বে থাকা জেন্ডার প্রমোটর রিপা বর্মন জানান, করোনার জন্য কিশোর কিশোরী ক্লাব বন্ধ হবার পর থেকেই অনেক শিক্ষার্থী ফোন করে জানতে চাই ক্লাস কবে শুরু হবে। আমরা লক্ষ্য করেছি খুব উৎসাহ উদ্দীপনার সহিত শিক্ষার্থীরা নিজেদের আত্মসচেতন হিসেবে গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। প্রায় ৪ মাস ক্লাস হয়েছিল এ সময়ে আমার এরিয়াতে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় ২টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে পেরেছি আমরা।

ক্লাবের শিক্ষার্থী অনন্যা সরকার তৃণা জানাই, বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক, যৌন নিপীড়ন, যৌতুক, নারী অধিকার ইত্যাদি নানান বিষয়ে আমরা অনেক কিছু শিখতে পেরেছি, আমি যা শিখেছি তা আবার আমার সহপাঠীদের সাথে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতাম, শোনার পর তারাও ক্লাবে অংশগ্রহণ করার আগ্রহ জানাতো।

তাসমিয়া সুলতানা সূচি নামের আরেক শিক্ষার্থী ফের কবে ক্লাবের কার্যক্রম শুরু হবে জানতে চাচ্ছিল এবং ক্লাসে ফিরে আগের মতো আত্মউন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের আগ্রহ প্রকাশ করে।

সুনামগঞ্জ জেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. আনিসুর রহমান এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, করোনার জন্য কিশোর কিশোরী ক্লাবের কার্যক্রম বন্ধ আছে। তাছাড়া ২০১৮ দিকে শুরু করা এ প্রকল্পের মেয়াদ চলতি মাসেই শেষ হচ্ছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট সুপারিশ করেছি প্রকল্পের মেয়াদ যেন বাড়ানো হয়। আশা করছি করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলেই পুনরায় কিশোর কিশোরী ক্লাবের কার্যক্রম চালু করা যাবে।

তিনি আরও জানান, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে চালু করা কিশোর-কিশোরী ক্লাব নারী সমাজের আত্মউন্নয়নে সরকারের একটি যুগোপযোগী প্রকল্প। বিশেষ করে হাওর দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া জনপদের কিশোর কিশোরীদের জন্য সত্যিকার অর্থে এটি একটি কার্যকরী উদ্যোগ।

বার্তাবাজার/পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর