আজ মঙ্গলবার ভোর ৫:৫২, ১৭ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং, ২রা কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৫শে মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

রাঙামাটিতে এখন বেঁচে থাকা দায়

নিউজ ডেস্ক | বার্তা বাজার .কম
আপডেট : জুন ১৬, ২০১৭ , ৩:১৭ পূর্বাহ্ণ
ক্যাটাগরি : চট্টগ্রাম বার্তা,প্রধান খবর
পোস্টটি শেয়ার করুন

একদিকে মৃত স্বজনদের জন্য কান্না-আহাজারি, অন্যদিকে নিজেদের বেঁচে থাকার লড়াই। আর যারা স্বজন হারায়নি তাদেরও জীবন না হারানোর সংগ্রাম।

সংগ্রাম খাবার পানির, খাবারের, কেরোসিনের, দিয়াশলাইয়ের, মোমবাতির। বিচ্ছিন্ন রাঙামাটিজুড়ে এখন এ রকম খণ্ড খণ্ড সংগ্রামচিত্র, হাহাকারবৃত্ত।

টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের পর গত মঙ্গলবার থেকে সড়কপথে বিচ্ছিন্ন রাঙামাটি। পণ্যবাহী কোনো যান ঢুকতে পারছে না এই শহরে। ভেঙে পড়েছে সব ধরনের সরবরাহ ব্যবস্থা। সময় যত গড়াচ্ছে রাঙামাটির সব কিছুই  যেন ফুরিয়ে আসছে।

বিদ্যুৎ নেই। তাই লাইনে পানির সরবরাহ বন্ধ। সবার পক্ষে বোতলজাত পানি কেনা সম্ভব নয়, সামর্থ্যও নেই অনেকের। যাদের আছে তারাও কিনতে পারছে না সংকট দেখা দেওয়ায়। যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় কুপির কেরোসিন ও মোমবাতির জন্য অনেকটা মারামারির মতো অবস্থা। বাড়তি দাম দিয়েও তা পাওয়া যাচ্ছে না। যাদের আইপিএস আছে, তাতে চার্জ নেই। চার্জ দেওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেকের মোবাইল ফোনও বন্ধ হয়ে গেছে।

বাজারে কোনো মাছ-মাংস নেই, সবজি ফুরাল বলে। কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ বন্ধ থাকায় এত দিন রাঙামাটির মানুষ নির্ভরশীল ছিল বাইরে থেকে আসা মাছের ওপর। কিন্তু যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার কারণে সেই মাছও আসছে না। আবার দুর্যোগের কারণে গরু-মহিষ জবাইও অনেকটা বন্ধ। ফলে ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে খাবারের সংকট।

গতকাল বৃহস্পতিবার শহরের প্রধান তিন বাজার তবলছড়ি, রিজার্ভবাজার, বনরূপা ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মজুদ কমে আসায় যা পাওয়া যাচ্ছে তা বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ২০ টাকা দামের আলু বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়, ৬০ টাকার মরিচ বিক্রি হতে দেখা গেছে ২০০ টাকায়।

গত দুই দিনে শহরের প্রায় প্রতিটি তেলের দোকান ও পেট্রল পাম্পে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও জ্বালানি তেল নেই। ফলে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে অন্যান্য সব গাড়ি। জ্বালানি তেল না থাকায় ব্যক্তিগত ও অফিশিয়াল জেনারেটরগুলোও বন্ধ হয়ে পড়ছে।

১৮ বছর আগে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা থেকে জীবন-জীবিকার তাগিদে রাঙামাটিতে এসেছিলেন দিনমজুর সুহেল মিয়া। তিনি বলেন, ‘১৮ বছর ধরে রাঙামাটিতে আছি, কিন্তু কোনো দিন এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটবে বুঝতে পারিনি। ’

রাঙামাটি শহরের লোকজন এখন সেখানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাউকে না গিয়ে সরকারের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহের পরামর্শ দিচ্ছে। কেননা স্বেচ্ছাসেবীরা গিয়ে বিপাকে পড়তে পারে।

জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী মেসার্স মিন্টু এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আব্দুল সাত্তার মিন্টু জানিয়েছেন, তাঁদের স্টকে থাকা তেল শেষ। চট্টগ্রাম থেকে তেল আনার সব সড়কপথ বন্ধ। বিশেষ ব্যবস্থায় কাপ্তাই হয়ে নৌপথে তেল আনতে যে খরচ পড়বে তা বহন করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব। তিনি বলেন, ‘তেলের জন্য মানুষের যে হাহাকার সৃষ্টি হয়েছে তা সত্যিই বেদনাদায়ক। এখন শুধু প্রশাসনের সহযোগিতা পেলেই আমরা তেল আনতে পারব, এ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। ’

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান গতকাল শহরের সব বাজারের ব্যবসায়ীদের ডেকে জরুরি সভা করেছেন। তাদের বলা হয়েছে, মানবিক বিপর্যয়ের এই পরিস্থিতিতে কোনো বাজারে কেউ যদি কোনো পণ্য বাড়তি দামে বিক্রি করে তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ব্যবসায়ী নেতারা জেলা প্রশাসককে আশ্বাস দিলেও বিভিন্ন বাজারে ক্রেতাদের জিম্মি করে বেশি দামে পণ্য বিক্রির চিত্র দেখা গেছে।

এ ছাড়া শহরের পানি সংকট মোকাবেলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে একটি বড় জেনারেটরের ব্যবস্থা করেছে জেলা প্রশাসন। গতকালের মধ্যেই জেনারেটরটি রাঙামাটি পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সেটি তখনো এসে পৌঁছায়নি। এই জেনারেটর এলে শহরে আংশিকভাবে পানি সরবরাহ চালু করা যাবে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় ঢাকা থেকে আরেকটি বড় জেনারেটর রাঙামাটি পাঠাচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান। তিনি জানিয়েছেন, এই দুটি বড় জেনারেটর রাঙামাটি আসার পর চালু করা সম্ভব হলেই পানি সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান হবে। তবে আপাতত পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস, উন্নয়ন বোর্ড এবং সওজের পানির ভাউচারগুলো দিয়ে শহরের পানি সংকট সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দিনের মধ্যে শহরের বিদ্যুত্ব্যবস্থা আংশিকভাবে চালু করা সম্ভব হবে। বিকল্প উপায় হিসেবে কাপ্তাই থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ কান্তি মজুমদার।

৫৭ বছর আগে বন্ধ হওয়া নৌপথ আবার চালু : এদিকে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কপথ বিচ্ছিন্ন থাকায় ৫৭ বছর আগে কর্ণফুলী নদী হয়ে কাপ্তাই থেকে চলাচলের নৌপথটি গতকাল আবার চালু করা হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রাঙামাটি-কাপ্তাই এই রুটে লঞ্চ চলবে। চট্টগ্রাম থেকে মানুষ সড়কপথে কাপ্তাই আসছে এবং সেখান থেকে লঞ্চে করে আসতে পারছে রাঙামাটি। আবার একইভাবে রাঙামাটি থেকে লঞ্চে কাপ্তাই যাচ্ছে এবং সেখান থেকে বাসে বা অন্য কোনো উপায়ে যেতে পারছে চট্টগ্রাম।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান জানান, জেলা প্রশাসন ও রাঙামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির উদ্যোগে এ লঞ্চ রুট চালু করা হয়েছে। সড়কপথ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে চারটি লঞ্চ রাঙামাটি শহর থেকে কাপ্তাই যাবে এবং কাপ্তাই থেকে রাঙামাটি আসবে।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে সাময়িক চলাচলের জন্য রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কটি চালু করতে পারবে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। কিন্তু এই সড়কে যান চলাচল শুরু করার জন্য অনেক সময় প্রয়োজন। তাই আমরা বিকল্প উপায় হিসেবে পুরনো নৌপথটি আবার চালু করেছি। আশা করছি, এর ফলে মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমবে। ’

চট্টগ্রাম বার্তা বিভাগের আরো খবর