বরিশালে ডিবি পুলিশের নির্যাতনে শিক্ষানবিশ আইনজীবীর মৃত্যুর অভিযোগে মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন তার বাবা ইউনুস মিয়া।
মামলায় ডিবির সাব-ইন্সপেক্টর মহিউদ্দিন মাহীসহ ৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এসআই মহিউদ্দিনকে ডিবি থেকে পুলিশ লাইন্সে ক্লোজ করা হয়েছে।
২৯ ডিসেম্বর রাতে সাগরদী ধান গবেষণা এলাকা থেকে আইনজীবী রেজাউল করিম রেজাকে গ্রেফতার করেন মহিউদ্দিন। এরপর তার কাছে ইনজেকটেবল ড্রাগসহ গাঁজা পাওয়া গেছে উল্লেখ করে মামলা দেওয়া হয়। পরদিন আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয় রেজাউলকে।
কারাগারের একটি সূত্র জানায়, ‘৩০ ডিসেম্বর জেলখানায় আনার সময়ই অসুস্থ ছিল রেজা। কাগজপত্রে অসুস্থ উল্লেখ করে তাকে গ্রহণ করে কারা কর্তৃপক্ষ। ১ জানুয়ারি রাতে দুই পায়ের সংযোগস্থল থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। ৩ জানুয়ারি ভোরে তিনি মারা যান।’
রেজার পরিবারের অভিযোগ-ডিবি হেফাজতে নির্যাতনের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। রেজার স্ত্রী মারুফা আক্তার বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নির্যাতনের কথা জানিয়েছে রেজাউল। এসআই মহিউদ্দিন নিজে নির্যাতন চালায় বলে জানান তিনি।’
মারুফা বলেন, ‘মহিউদ্দিন এবং আমাদের বসবাস একই এলাকায়। এর আগেও বিভিন্ন সময় আমার স্বামীকে ভয়ভীতি দেখায় সে।’
রেজার বাবা ইউনুস মিয়া বলেন, ‘হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় শুয়েও আমার ছেলে বলেছে তার কাছে কোনো মাদক ছিল না। মহিউদ্দিন তার পকেটে মাদক ঢুকিয়ে দিয়েছে। এ ঘটনায় আদালতে মামলা করেছি।’
মামলার তদন্ত শেষে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
আতঙ্কের আরেক নাম ডিবি মহিউদ্দিন : সাগরদী ধান গবেষণা এলাকার হামিদ খান সড়কের বাসিন্দা ছিলেন রেজাউল করিম রেজা। একই এলাকায় বসবাস এসআই মহিউদ্দিনেরও। প্রথমে কোতোয়ালি মডেল থানা এবং পরে ডিবি পুলিশে কর্মরত অবস্থায় এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেন মহিউদ্দিন। যখন যাকে খুশি গ্রেফতার, মিথ্যা অভিযোগে মামলা, অর্থ আদায়, নির্যাতন-এসব ছিল তার নৈমিত্তিক কাজ।
শেরেবাংলা সড়কের বাসিন্দা মো. কামাল বলেন, ‘২০১৮ সালের ২৮ নভেম্বর বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি অভিযোগের সাক্ষী দিতে গিয়েছিলাম। অভিযোগটি ছিল কোতোয়ালি থানার তৎকালীন এসআই শামীমের ঘুস দাবির বিষয়ে। থানায় ডেকে নিয়ে গুপ্তচরবৃত্তি ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতারের পর তদন্তভার দেওয়া হয় এসআই মহিউদ্দিনকে।
কোনো তদন্ত না করে তিনি আমাকে হয়রানি করে চলছেন। কিছুদিন আগেও হুমকি দিয়ে বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে তোমাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
রূপাতলী গ্যাসটারবাইন এলাকার বাসিন্দা রিপন মৃধা, রিপন আকন ও আফজাল হোসেন মিলে বিভিন্ন এলাকায় জমির ব্যবসা করেন। একদিন তাদের ডেকে নেন এসআই মহিউদ্দিন। দাবি করেন তিন লাখ টাকা। না দিলে ক্রসফায়ারের হুমকি দেন।
রিপন মৃধা বলেন, ‘টাকা না দেওয়ায় ২০১৬ সালের ১৯ অক্টোবর আফজাল হোসেন ও ২৭ অক্টোবর রিপন আকনকে মিথ্যা মামলা দিয়ে থানায় নিয়ে ঝুলিয়ে মারধর করা হয়। এরপর নাকে-মুখে গরম পানি ঢেলে শেখানো স্বীকারোক্তি আদালতে দিতে বাধ্য করা হয়।’
রূপাতলী ২৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাহাবুব মোল্লাকেও ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়েছিল মহিউদ্দিন। মাহাবুব মোল্লার স্বজনরা জানান, ‘২০১৬ সালের শেষের দিকে উকিলবাড়ি সড়কের একটি জমি নিয়ে দ্বন্দ্বে মাহাবুব মোল্লাকে প্রকাশ্যে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়েছিল মহিউদ্দিন।’ হয়রানি থেকে রেহাই পাননি ২৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনিছুর রহমানও।
যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘যেখানেই জমি ক্রয়-বিক্রয় হতো, সেখানেই নাক গলাত মহিউদ্দিন। ২০২০ সালের মাঝামাঝি আমার ওয়ার্ডের একটি জমির বিরোধ নিয়ে সালিশি করতে গিয়ে টাকা দাবি করেন মহিউদ্দিন। সেখানে অস্ত্রের ভয় দেখান তিনি। এমনকি ক্রসফায়ারেরও হুমকি দেন।’
রূপাতলী চান্দু মার্কেট শেরেবাংলা সড়কের বাসিন্দা হারিছুল ইসলাম জানান, ‘শেরেবাংলা সড়কে আমার পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত জমিতে নজর পরে মহিউদ্দিনের। ২০১৯ সালের ২২ জুলাই রাত সাড়ে ১০টায় সে আমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে অস্ত্র দেখিয়ে বলে, তুই ওই জমির কাছে যাবি না। গেলে এনকাউন্টার দিয়ে দেব। মহিউদ্দিনের আক্রমণাত্মক আচরণে আমি ভয় পেয়ে যাই।
নিরুপায় হয়ে চিৎকার দিলে লোকজন বাইরে বেড়িয়ে এলে আমি বেঁচে যাই। তার কথামতো সম্পত্তি ছেড়ে না দেওয়ায় আমাকে অন্যের পুরোনো একটি ইয়াবা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে চালান দিয়ে দেয়।’ হারিছুল বলেন, এ নিয়ে পুলিশ কমিশনার বরাবর গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি।’
রুবেল নামে চান্দু মার্কেট এলাকার এক দোকানির কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন মহিউদ্দিন। রুবেল বলেন, ‘তার ভয়ে দোকান নিয়ে ৯নং রোডে চলে এসেছি।’ ২৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা রফিক মীরা, মুনসুর মীরা, মনির মিরাকে ২০১৯ সালে কোতোয়ালি থানায় আটকে নির্যাতন করে তাদের জমি দখল করে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে।
বিপুল বিত্তবৈভব : মহিউদ্দিনের গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায়। তার বাবা আব্দুল মজিদ ছিলেন পুলিশের কনস্টেবল। তদবির করে মজিদ ছেলে মহিউদ্দিনকে কনস্টেবল পদে চাকরি পাইয়ে দেন। সেখান থেকে পদোন্নতি পেয়ে মহিউদ্দিন এসআই হন। বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হওয়ারও অভিযোগ রয়েছে এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
শেরেবাংলা সড়কের বাসিন্দারা বলেন, ২০১৩ সালে ওই এলাকায় ভাড়া বাসায় উঠেন মহিউদ্দিন। মাত্র ৩ বছরের মাথায় ওই সড়কে ৪৫৯০, ৪৫৯৩, ৪৫৬৯ দাগের ৬.৫০ শতাংশ জমি ৩২ লাখ টাকা দিয়ে ক্রয় করেন। সেখানে গড়ে তোলেন ভবন।
এছাড়া রূপাতলী পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের পেছনে আবাসিক এলাকায় ৩৩ শতাংশ, ২৫নং ওয়ার্ডের উকিলবাড়ি সড়কে রফিক মেম্বারের বাড়ির পেছনে ৬ শতাংশ, র্যাব-৮-এর সদর দপ্তর সংলগ্ন রুপাতলী এলাকায় ৩০ শতাংশ, জাগুয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের পেছনের স্কাউট অফিস সংলগ্ন ফরিদ মুন্সীর বালু ভরাট করা প্লটে ১০ শতাংশ এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন খয়রাবাদ সেতুর ঢালে তার ৫০ শতাংশ জমি রয়েছে বলে জানা গেছে।
এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য এসআই মহিউদ্দিনের মোবাইল নম্বরে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। বরিশালের পুলিশ কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান বলেন, ‘আমাদের কাছে যেসব অভিযোগ এসেছে তার সবকটিরই তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে মাহিউদ্দিনকে পুলিশ লাইন্সে ক্লোজ করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি যে অভিযোগ করা হয়েছিল, সেটি কোন পর্যায়ে আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটিরও তদন্ত চলছে। আমরা বাহিনীর কারও অন্যায়কে কখনো প্রশ্রয় দিইনি এবং ভবিষ্যতেও দেব না। সূত্র: যুগান্তর।
বার্তাবাজার/ই.এইচ.এম