আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে হাল ধরার পাশাপাশি টানা দুইবার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। একবার ছিলেন সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য। ছিলেন সাবেক মন্ত্রী। জাতীয় চার নেতা ও দেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তানও ছিলেন তিনি। অন্যন্য হতে হয়তো এর চেয়ে বেশি আর কিছু লাগে না। সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ৩ জানুয়ারি।
এই কীর্তিমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে দলীয় কোনো কর্মসূচীর আয়োজন করেনি সারাজীবন যে দলের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে গেলেন সেই আওয়ামী লীগ। এমনকি বনানীতে অবস্থিত তার সমাধিতেও বিকাল ৫টা পর্যন্ত কোনো কেন্দ্রীয় নেতাকে যেতে দেখা যায়নি কয়েক মুহুর্তের জন্য।
দেশের নামকরা এই রাজনীতিবিদের কবরের কাছাকাছি সারাদিনই গণমাধ্যমকর্মীরা সংবাদ সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ধারণা ছিল কেন্দ্রের হাই প্রোফাইল নেতৃবৃন্দ দামি গাড়ি হাঁকিয়ে যাবেন প্রয়াত সৈয়দ আশরাফের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। কিন্তু কেউ যাননি। অনেকটা নিভৃতেই ছিল ২য় মৃত্যুবার্ষিকীতে পদার্পণ করা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কবর। এ নিয়ে দিনব্যাপী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনাও কম হয়নি।
অবশেষে বিকাল ৫টায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ পুস্পস্তবক নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে যান সৈয়দ আশরাফের কবরে। সাথে যুবলীগের কয়েকজন নেতাকে দেখা যায় তখন।
তবে ভুলে যায়নি সৈয়দ আশরাফের পরিবার। তার ছোট বোন ও কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ সৈয়দা জাকিয়া নুর লিপি এবং তার পরিবারের সদস্যরা সকাল ৮টায় ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তার কবরে। পরিবারের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় দোয়ার।
বনানী কবরস্থানে সারাদিন অপেক্ষা করতে থাকা গণমাধ্যমকর্মীদের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করে সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী বাণি ইয়াসমিন লিখেন, ছবিটা আজ সকালের। বনানী কবরস্থানে সাংবাদিকদের অপেক্ষা। আওয়ামী লীগের বড় কোনো নেতা হয়তো সৈয়দ আশরাফ ভাইকে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন; এই ভেবে উনারা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন। না, কেউ যাননি। কারও সময় হয়নি। জীবিত সৈয়দ আশরাফের চেয়ে মৃত সৈয়দ আশরাফ আরও বেশি শক্তিশালী! লাখো কর্মীর আবেগ সৈয়দ আশরাফ। অনুভূতির আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাদের স্বল্পভাষী, ডেডিকেটেড এবং প্রজ্ঞাবান আশরাফ ভাইকে মননে মগজে ধারণ করে। সেই নাম মোছার সাধ্য কারও নেই।
বিকালে মাহবুব-উল হানিফ শ্রদ্ধা জানালে সেই ছবিটাও তিনি ফেসবুকে আপলোড করেন। তখন লিখেন, সকালে খুব মন খারাপ করে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম নিজের ওয়ালে। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা আশরাফ ভাইকে শ্রদ্ধা জানাতে যাননি বলে। কিছুক্ষণ আগে পাওয়া এই ছবিগুলো দেখে আমি কাঁদছি। যাক কেউ একজন তো লাখো কর্মীর মনের কথা আর চোখের ভাষা বুঝল। বঙ্গবন্ধুর বাঙালিদের পক্ষ থেকে সৈয়দ আশরাফকে স্মরণ করার জন্য ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা মাহবুব-উল আলম হানিফ ভাই।
এর আগে বিকাল তিনটার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পথে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম সৈয়দ আশরাফের কবরে শ্রদ্ধা জানান। এসময় তার সাথে ছিলেন উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম ও স্থানীয় সরকার সচিব হেলালুদ্দিন আহমেদ।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে যখন সারাদেশেই বয়ে যাচ্ছে একের পর এক সমালোচনা। ঠিক সেই মুহুর্তে অনেকটাই নীরবে প্রয়াত হওয়া সৈয়দ আশরাফকে নিয়ে সাধারণ মানুষের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নীরব আহাজারিই প্রমাণ করে সৈয়দ আশরাফ সত্যিকারের মানুষ ছিলেন।
সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কর্মসূচী না দেওয়ায় হতাশ হয়েছেন দেশের রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষজন ও পেশাজীবীরা।
দেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেল ডিবিসি নিউজের সংবাদকর্মী জাহিদ হাসান তার ফেসবুকে লিখেন, তবে কি আওয়ামী লীগ থেকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার উঠে যাচ্ছে! সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে যায়নি দলটির জাতীয় নেতারা। নেই কোনো আনুষ্ঠানিকতা। আবদুর রাজ্জাক, জোহরা তাজউদ্দিন, আবদুস সামাদ আজাদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ কোনো জাতীয় নেতার মৃত্যুবার্ষিকীতে দলীয় কোনো কর্মসূচি নেই!
এদিকে প্রয়াত এই নেতার মৃত্যুবার্ষিকীতে কিশোরগঞ্জে দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করা হয়। শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত তার গ্রাম বীর দামপাড়ায় খতমে কোরআন, দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও গ্রামবাসী। সকালে সদর উপজেলা পরিষদে সৈয়দ আশরাফের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম স্মৃতি সংসদ। বিকালে জেলা আওয়ামী লীগ অফিসে আয়োজন করা হয় আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের।
বার্তাবাজার/এসজে