বিলুপ্তির পথে খেজুর গাছ, হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর রস

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় শীতের সকালে এক দশক আগেও চোখে পড়তো রসের হাঁড়ি ও খেজুর গাছ কাটার সরঞ্জামসহ গাছির ব্যস্ততার দৃশ্য। অযত্ন অবহেলা আর চারা রোপনে অনিহা এবং ইটভাটায় খেজুর গাছ পোড়াঁনোর ফলে দিন দিন কমছে খেজুর গাছ। বিলুপ্ত হতে চলেছে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা গাছিদের পেশা। এখন আর তেমন চোখে পড়ে না খেজুর গাছ থেকে রস বের করা বিশেষ পেশার মানুষ গাছিদের।

১০-১৫ বছর আগে আলফাডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাটলেই চোঁখে পড়তো সারি সারি খেজুর গাছ। এলাকার প্রায় প্রতিটি গ্রামে বা মহল্লায় গাছিদের দেখা যেত খেজুর গাছের মাথার দিকে বিশেষ কায়দায় কান্ড ছেটে হাড়ি পাততে। শীতের সকালে গাছিরা খেজুর রসের হাড়ি নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতো এবং নিমিষেই শেষ হয়ে যেতো খেজুরের রস। এখন আর বিস্তৃর্ণ এলাকা ঘুরেও চোখে পড়ে খেজুরের গাছ কিংবা গাছিদের খেজুরের রস নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো। কিছু কিছু এলাকায় ২-১টি খেজুর গাছ দেখা যায় সেগুলো দাঁড়িয়ে আছে কালের স্বাক্ষী হয়ে। গ্রাম বাংলায় ঐতিহ্য খেজুর রসের যে সু-প্রিয়তা ছিল তা ক্রমেই কমে যাচ্ছে আর হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর রসের সুখ্যাতি।

ছবিঃ খেঁজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে হাঁড়িতে ঢালছেন গাছি মফিজুর মিয়া। ছবি-বার্তা বাজার

শীতের সকালে রোদে বসে খেজুরের রস এবং মুড়ি খাওয়া ছিল গ্রামের একটি রেওয়াজ ও ঐতিহ্য। কৃষকেরা ঘুম থেকে ওঠে খেজুরের রসের সাথে মুড়ি দিয়ে খেয়ে মাঠে যেত। এখন খেঁজুর রসের স্বাদ সবার ভাগ্যে জোটে না। গাছিরা তাদের শীতকালের এই পেশা ছেড়ে জড়িয়ে গেছে অন্য কাজে। বর্তমান ৮-১০টি গ্রাম ঘুরলেও একজন গাছি পাওয়া দুষ্কর।

সরেজমিনে উপজেলার পাঁচুড়িয়া গ্রামে মফিজুর মিয়া নামে এক গাছিকে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে নিচে নামতে দেখা যায়। পরে তার সাথে কথা হলে জানান, ‘তিনি ৩০ বছর বয়স থেকে খেজুর গাছ কাটা শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তার বয়স ৬৫ বছর। তিনি আরও বলেন, আগের মত এলাকায় খেজুর গাছ নেই। যার কারণে গাছিরা খেজুর গাছ কাটা বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি অল্প কয়েকটি গাছ কাটেন। পরে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরী করে বাজারে বিক্রি করেন। তাতে প্রতিদিন ১২০০-১৫০০ টাকা আয় হয় যা দিয়ে চলে তার সংসার। শীত মৌসুমে তিনি এই কাজ করেন। বছরের বাকী সময় তিনি নদীতে মাছ ধরেন।’

উপজেলার সদর ইউনিয়নের জাটিগ্রামের বাসিন্দা মালেক থান্দার নামে এক গাছির সাথে কথা হলে তিনি জানান, ‘এলাকায় আগের মতো খেঁজুর গাছ নেই বলে ৮/৯ বছর তিনি এই পেশা পরিবর্তন করে কৃষি কাজ করেন। তিনি জানান, আগে এক হাঁড়ি রসের দাম মাত্র ৫০-৬০ টাকা বিক্রি করতেন। এখন সেই খেজুর রস ৪০০-৫০০ টাকা দিয়েও পাওয়া যায় না।’

আলফাডাঙ্গা উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম আহাদুল হাসান বার্তা বাজারকে বলেন, ‘খেজুরের রস পাওয়া বড়ই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। বেশ কয়েকবছর খেজুর রসের দেখা পেলাম না।’

সচেতন মহল জানান, গ্রামের মানুষকে বেশি বেশি করে খেজুর বীজ বপন করার বিষয়ে উৎসাহিত ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসা উচিত। তা ছাড়া প্রতি বছর যে পরিমাণে খেজুর গাছ কাটা হচ্ছে এবং ছোট ছোট ইটভাঁটায় পোড়ানো হচ্ছে তাতে আর কয়েক বছর পর খেজুর রস একদম বিলুপ্তই হয়ে যাবে।

আলফাডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রিপন প্রসাদ সাহা বার্তা বাজারকে বলেন, ‘আমাদের অসচেতনার কারণে আজ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে খেজুর গাছ। খেজুর গাছের এই সঙ্কট নিরসনে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং বেশি বেশি করে খেজুর বীজ বপন করতে হবে।’

বার্তাবাজার/পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর