নাম মাত্র থ্রী-এফ মডেল পুকুর; যা বাস্তবে নেই!

বনের পাশে বসবাস করা মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বনের উপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে নোয়াখালী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বুড়িরচর ও জাহাজমারা ইউনিয়নে বনবিভাগের জায়গায় ১শতটি পুকুর খনন করা হলেও এই প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে উদাসীনতা ও অনিয়মের কারণে প্রকল্পটি এখন উপকারভোগীদের গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বনবিভাগের জায়গায় সবুজ বেস্টনীর পরিবর্তে তৈরী করা হয়েছে থ্রী-এফ মডেল পুকুর। যেখানে পুকুর পাড়ে বিভিন্ন ফল ফলাদির গাছ, পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও বিভিন্ন প্রকার সবজি চাষের অপরূপ দৃশ্য থাকার কথা, সেখানে বাস্তবে এই দৃশ্যের চিহ্নও নেই।

প্রকল্পের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছিল জীবিকার বৈচিত্র্যায়নের মাধ্যমে জলবায়ুজনিত বিপদাপন্ন উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য নিরসন, অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় বনের ওপর নির্ভরতা কমানো হবে। প্রকল্পের আওতায় সংরক্ষিত বনা লের ভিতরে পুকুর তৈরি করে সেখানে মাছ চাষ ও পুকুর পাড়ে শাক-সবজি চাষ করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে। যা জলবায়ুজনিত বিপদাপন্ন উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য নিরসন করবে।

এই প্রকল্পের একটি বিশেষ মডেল হলো ‘বনজ, ফলদ, মৎস্য (থ্রিএফ) মডেল’। প্রতিটি মডেল বা পুকুরের দৈর্ঘ্যে ২৫২ ফুট এবং প্রস্থে ৪৯ ফুট। পুকুর হবে ৮ ফুট গভীর ও পাড়ের উচ্চতা হবে ৮ ফুট। প্রতিটি পুকুর খননের জন্য বরাদ্ধ ধরা হয়েছে ছিল ৮৯ হাজার টাকা করে। মডেলটি ম্যানগ্রোভ বনের মাঝখানে পরিত্যক্ত বনভূমিতে নির্মাণ করার কথা থাকলেও বাস্তবে এই নিয়ম মানা হয় নি অনেকাংশে। কিছু কিছু জায়গায় বন কেটে পুকুর খনন করা হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ইউএনডিপির আর্থিক সহযোগিতায় উপকূলীয় বনায়ন ও পুনঃবনায়নে কমিউনিটি ভিত্তিক অভিযোজন (আইসিবিএ-এআর) নামক প্রকল্পটি ২০১৮ সাল থেকে বাস্তবায়ন করে আসছে। প্রতি হেক্টর ভ’মিতে ৫টি পুকুর খনন করা হযেছে। এর মাধ্যমে নোয়াখালী হাতিয়া উপজেলায় একশতটি ও ভোলা জেলার তজমুদ্দিন উপজেলায় ৪০টি পুকুর খনন করা হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাতিয়ার বুড়িরচর ইউনিয়নের বড়দেইল এলাকার বেড়ীর বাহিরে বনবিভাগের সাগরিয়া রেঞ্জের চর আলিম বিটের জায়গায় বাগানের মধ্যে প্রথমে ১০টি পরে বাগানের বাহিরে দুই ভাগে ৫৫টি পুকুর খনন করা হয়েছে। যা পরে এক একটি পুকুর এক একটি ভূমিহীন পরিবারকে দেওয়া হয় এর সুবিধা ভোগ করার জন্য।

বাগানের বাহিরের ৫৫টি থ্রী এফ মডেল পুকুরের একেবারে পূর্বপাশে অবস্থিত ১৫নম্বর পুকুরটির। কাগজে কলমে থ্রী এফ মডেল বলা হলেও বাস্তবে ফল-ফলাদি, মাছ ও গাছের কোন অস্থিত্ব নেই এই পুকুরে। জোয়ারের পানিতে ভেঙ্গে সমতলের সাথে মিশে গেছে এর তিনটি পাড়, পুকুরে নেই পানি। এই মডেল পুকুরের মালিক বুড়রচর ইউনিয়নের পূর্ব বড়দেইল গ্রামের আলা উদ্দিন মাঝি (৩৫)। জোয়ারের পানিতে পাড় ভেঙ্গে একই অবস্থা বাগানের বাহিরের ৫৫টি পুকুরের দক্ষিন পাশে অবস্থিত ১৫টি পুকুরের।

এছাড়া অন্য ৪০টি পুকুর খনন করা হয়েছে বাগানের বাহিরে বনবিভাগের গেজেট ভুক্ত জায়গায়। এই জায়গায় উপকূল রক্ষায় সবুজ বেস্টুনী তৈরী করার কথা থাকলেও আরো ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে থ্রী এফ মডেল পুকুর খনন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে এর বিপরীত চিত্র। এসব পুকুর সুবিধাভোগিদের দেওয়া হলেও সঠিক তদারকি ও সঠিক পরিকল্পনা না থাকার কারনে অনেকটা পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

পূর্ব বড়দেইল গ্রামের শাহজাহানের ছেলে দিলদার উদ্দিন (৩০) এর সাথে আলাপকালে তিনি জানান, এসব পুকুর খনন করার পর বিভিন্ন দপ্তর থেকে উপকারভোগীদের মাছের পোনা, গাছের চারা ও বীজ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রথম বছর সবাই আন্তরিক থাকলেও পরে আর খোঁজ খবর নেয় নি।

চর আলিম বিটের বাগানের বাহিরে অবস্থিত ৫৫ নম্বর থ্রী-এফ মডেল পুকুরের মালিক মহিন উদ্দিন (৩০) জানান, প্রকল্পের নিয়মানুযায়ী পুকুরের পাড় সমতল থেকে ৮ ফুট উচ্চতা করার কথা। কিন্তু বনবিভাগ মাত্র ৪-৫ফুট উচ্চতায় পাড় করে দায় সারা কাজ করার ফলে জোয়ারের পানিতে অধিকাংশ পুকুরের এখন বেহাল দশা। অন্যদিকে মহিন উদ্দিন ও অন্যান্য উপকারভোগীরা নিজ শ্রমে পুকুর পাড় তৈরী করে নিলে খরচ দেওয়ার কথা দিলেও বাস্তবে তাদেরকে বি ত করা হয়েছে বলে জানান তারা।

প্রকল্প অনুযায়ী বনের মধ্যে পরিত্যাক্ত জায়গায় এই একশতটি পুকুর খননের কথা থাকলেও হাতিয়ায় অধিকাংশ পুকুর খনন করা হয়েছে বনের মধ্যে। কিছু কিছু খনন করা হয়েছে বন কেটে। এর মধ্যে ফল-ফলাদির জন্য কৃষিবিভাগ, বনায়নের জন্য বনবিভাগ ও মাছ চাষের জন্য মৎস্যবিভাগ বাস্তবায়ন করার কথা। কিন্তু তাতেও ছিল সমন্বয়হীনতা।

হাতিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: নুরুল ইসলাম জানান, বনবিভাগ ও ইউএনডিপির প্রতিনিধিদের সরবরহ করা তালিকা অনুযায়ী উপকারভোগীদের মাঝে বিভিন্ন গাছের চারা ও কৃষি উপকরন কিতরন করা হয়েছে। এখন কেউ যদি সঠিক ভাবে তা না লাগিয়ে থাকেন আমাদের কিছুই করার নেই। একই ভাবে দায়সাড়া উত্তরদেন বর্তমানে মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন।

এই প্রকল্পের ইউএনডিপির কমিউনিটি ডেভলপমেন্ট কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন , কৃষি , মৎস্য, ও বনবিভাগ এই প্রকল্পটি বাস্ত বায়ন করবে। আমরা শুধু সরকারের এসব বিভাগের মধ্যে সমন্বয়টা করে থাকি। প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের বিষয়ে তিনি কিছু বলেতে রাজি হন নি।

প্রকল্পের সভাপতি (পদাধিকার বলে) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: ইমরান হোসেনে জানান, থ্রী- এফ মডেল পুকুর এই প্রকল্পটি সম্পর্কে অনেক আলোচনা সমালোচনা আমি আসার পর থেকে শুনতেছি। আমি একটি মিটিং কল করেছি। মিটিংএ এই প্রকল্পের সাথে জড়িত সকলকে উপস্থিত থাকতে বলেছি। প্রয়োজনে সাংবাদিকরা মিটিংএ উপস্থিত থাকতে পারেন।

বার্তাবাজার/পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর