প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করেই দেবহাটায় কৃষি জমিতে একের পর এক গড়ে তোলা হচ্ছে ইট ভাটা। এতে করে ক্রমে কমছে কৃষি জমি। উৎপাদন কম হচ্ছে কৃষি পণ্য। এভাবে চলতে থাকলে দেখা দিতে পারে খাদ্য সংকট। তেমনই দেবহাটা উপজেলার সুশীলগাঁতীতে ফসলী জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে মেসার্স কে বি ব্রিকস নামের একটি ইটভাটা। এতে নষ্ট হতে বসেছে ফসলি জমি ও পাশ্ববর্তী জনবসতি এলাকার পরিবেশ।
চলতি বছরের ২৩ জুন দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় থেকে ০৫.৪৪.৮৭২৫.০০১.০৭.০০৬.২০-৫২২ নং স্মারকের অবৈধ ভাটা সম্পর্কে জেলা প্রশাসনের নিকট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। উক্ত প্রতিবেদেনে উল্লেখ করা হয় যে, ভাটার জমি এক ফসলী বলা হলেও সেটি ৩ ফসলী জমি। পাশ্ববর্তী ফসলের জমির পানি নিস্কাশনের কালভার্ট ভরাট করে ইট ভাটার কাজ পরিচালিত হচ্ছে। তাদের এই অবৈধ কর্মকান্ডে স্থানীয়রা অতিষ্ট হয়ে পড়েছে। যা বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য আপরাধের আওতায় পরিলক্ষিত হওয়ায় ১৭ সেপ্টেম্বর ২২.০২.৪০৮৭.০১৬.৭১.০১৪.১৮-৮৫ স্মারকে সাতক্ষীরা জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সরদার শরীফুল ইসলাম এক পত্রের মাধ্যমে কেবি ব্রিকস’র সকল কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ প্রদান করেন। এমনকি ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সকল কার্যক্রম বন্ধ না করা হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট টিম মামলা, জরিমানা আদায়সহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
উল্লেখ্য যে, দেবহাটা উপজেলার সদর ইউনিয়নের সুশীলগাতী গ্রামের প্রায় ২০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে গত বছর কে বি ব্রিকস নামের ইটভাটা নির্মানের কাজ শুরু করেন ঢাকার গুলশানের ক-৬১/৮ কালাচাদপুর এলাকার রবিউল ইসলাম নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। এই ভাটা বন্ধে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের কাছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের কাছে কৃষকরা গণস্বাক্ষরকৃত লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
নির্মানাধীন ইটভাটার চারপাশে জুড়ে মাত্র কয়েক গজ দুরত্বের মধ্যেই রয়েছে বিস্তৃর্ন ধানের ক্ষেত ও শীতকালীন সবজি সহ অন্যান্য ফসলের সমারোহ। এছাড়া ইটভাটার পুর্ব ও দক্ষিন দিকে জনবহুল দেবহাটা সদর, পশ্চিমে সুশীলগাতী ও উত্তর পাশে রয়েছে টাউনশ্রীপুর সহ কয়েকটি গ্রামের জনবসতি। এসব এলাকায় জনবসতির পাশাপাশি রয়েছে একাধিক স্কুল-কলেজ, মাদ্রসা, মসজিদসহ বহু ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আবাসিক এলাকার পাশেই ইট ভাটা স্থাপন করায় কয়েকশ পরিবার হুমকির মুখে পড়বে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
১৯৫১ সালের জমিদারী দখল ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯০ নং ধারা অনুযায়ী সরকারের অনুমতি ছাড়া কৃষি জমি অকৃষি কাজে ব্যবহার বা ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর সম্পূর্ণ বে-আইনী হলেও ইট ভাটাটি নির্মানে জমি হস্তান্তর করা হয়েছে।
এই আইন অমান্য করে জমি হস্তান্তর বা ব্যবহার করলে সে জমি বাজেয়াপ্ত করা যেতে পারে। এই আইনের ৭৬ নং ধারা মতে কোন জমি কৃষক ছাড়া অন্য কারও কাছে হস্তান্তর কিংবা বন্দোবস্ত দেয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। এ সকল আইনও না মেনে প্রস্তাবিত ভাটা এলাকার জমি ইজারাদাতা ও ভাটা কর্তৃপক্ষ। এদিকে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রালয়ের জারি করা ইটখোলা নির্মানের জন্য ভূমি ব্যবহার প্রসঙ্গ শীর্ষক সার্কুলারে (স্মারক নং ভূ:ম:/ শ-১০/শু:দ:/ সাধারণ/১৭/১০/৫৭২(৬৪) তারিখ ২৫-৭-১৯৯০ইং) বলা আছে, অনুর্বর কৃষি জমির ওপর ইটের ভাটা তৈরীর প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কাছে দাখিল করতে হবে। জেলা প্রশাসক তদন্ত সাপেক্ষ কেবলমাত্র অনুর্বর অকৃষি জমিতেই ইটের ভাটা স্থাপনের অনুমোদন দেবেন। ভাটা তৈরীর আগে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও জেলা প্রশাসকের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। চুক্তিপত্রে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি শর্ত লিখিত থাকতে হবে, যেমন একটি ইটের ভাটার জন্য দেড় একরের বেশি জমি ব্যবহার করা যাবে না। ইট তৈরীর জন্য একই স্থান থেকে মাটি কাটতে হবে। মাটি কাটার স্থানকে পাড় বিশিষ্ট পুকুরে পরিণত করতে হবে, যেন মাছের চাষ করা যায়। এই শর্ত ভঙ্গ কারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। কিন্তু ভাটার মালিক রবিউল ইসলাম এমন কোন চুক্তি ছাড়াই ভাটাটি স্থাপন করেছেন।
স্থানীয়রা বার্তা বাজারকে জানান, জনবসতি এলাকার পাশে ফসলের জমিতে ইট ভাটা গড়ে উঠলে চাষের উপর প্রভাব ফেলবে। এতে ফসল উৎপাদন কমবে। খাদ্যের ঘাট্টি দেখা দেবে। এমনকি পরিবেশে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। তাই ফসলি জমি থেকে ভাটা অপসরণ করার দাবি স্থানীয়দের।
বার্তাবাজার/এ.আর