দেখতে দেখতে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিলো ২০২০ সাল। পুরনো বছরের সব দুঃখ-কষ্ট আর প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাবের খাতাকে মুছে দিয়ে ২০২১ সালের আগমন। করোনাকালীন সময়ে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সত্বেও নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে(নোবিপ্রবি) তে ২০২০ এ ঘটে যাওয়া এমন কিছু ঘটনা রয়েছে যা বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে স্থান করে নেওয়ার পাশাপাশি দেশজুড়ে তৈরি করেছে আলোচনা। বছরজুড়ে ঘটে যাওয়া নোবিপ্রবির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ নিয়েই আজকের এ প্রতিবেদন।
বছরের শুরুতে নানা উৎসব ও আমেজের মধ্য দিয়ে নোবিপ্রবির ১৫ তম ব্যাচকে বরণ করে নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত থাকায় বছরের শুরু থেকেই একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে চলতে শুরু করে।
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনা প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনানুযায়ী ১৭ ই মার্চ থেকে নোবিপ্রবিকে বন্ধ ঘোষনা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরর্বতীতে সরকারি নির্দেশনানুযায়ী দফায় দফায় বাড়ানো হয় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সময়সীমা। তবে পরর্বতীতে প্রশাসনিক কার্যক্রমকে স্বাভাবিক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
করোনা শনাক্ত কেন্দ্র ও গবেষণার সাফল্য
করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকে দেশজুড়ে নজর কাড়তে সক্ষম হয় নোবিপ্রবি। নিজস্ব খরচে বৃহত্তর নোয়াখালী অন্চলের জন্য কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ ল্যাব স্থাপন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।৭ মে নোবিপ্রবির অণুজীববিজ্ঞান বিভাগে করোনা পরীক্ষার ল্যাব উদ্বোধন করা হয় ও ১১ মে থেকে করোনা পরীক্ষা শুরু হয়। নোবিপ্রবি কোভিড ল্যাবের গুণগতমান পরীক্ষার জন্য প্রেরিত নমুনা পরপর দুইবার আইইডিসিআর কর্তৃক শতভাগ সঠিক বলে প্রমাণিত হয়।
নোবিপ্রবি ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে ১০০টি করোনাভাইরাসের জীবন রহস্য উম্মোচন কার্যক্রম শুরু হয়। নোবিপ্রবি ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় নোয়াখালীর শহীদ ভুলু স্টেডিয়ামের কোভিড-১৯ আইসোলেশন সেন্টারের নর্দমা, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও শৌচাগারের সঞ্চালন লাইন থেকে মোট ১৬ বার বর্জ্য পানির নমুনা সংগ্রহ করে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পান গবেষক দল।
গবেষণা ও আবিষ্কার
গণস্বাস্থ্যের র্যাপিড টেস্ট কিট উদ্ভাবনে টিমের অন্যতম সদস্য ছিলেন নোবিপ্রবির অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. ফিরোজ আহমেদ। গোল্ড ন্যানো পার্টিকেলের মাধ্যমে করোনা শনাক্তকরণের কিট তৈরি করতে সক্ষম হন নোবিপ্রবির ২ গবেষক- এপ্লাইড কেমেস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ফিরোজ আহমেদ।
নোবিপ্রবির মৎস্য ও সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল হোসেন
‘গ্লাইসেরা শেখমুজিবি’ (Glycera sheikhmujibi) নামে নোয়াখালীর হাতিয়া উপকূলের জলাভূমি থেকে নতুন অমেরুদণ্ডী প্রাণী (পলিকীট প্রজাতি) সন্ধান পান। নোবিপ্রবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও শিক্ষাকার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়।
করোনা তথ্য জানার জন্য করোনা আল্যার্ট নামের মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেন ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ড. মুহাম্মদ শাহানুল ইসলাম। তাছাড়াও করোনা আক্রান্তদের সেবায় ডা. আপা নামে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অ্যাপ তৈরি করেন নোবিপ্রবির ফলিত গণিত বিভাগের শিক্ষর্থী আহমেদ কাওছার।
সমুদ্র বিজ্ঞান ও সামুদ্রিক সম্পদ নিয়ে গবেষণার লক্ষ্যে ২৭ ডিসেম্বর নোবিপ্রবির অধীনে শেখ হাসিনা সমুদ্র বিজ্ঞান ও সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়। যা নোবিপ্রবির অগ্রযাত্রাকে আরো বেগবান করে।
অনলাইন শিক্ষা যুগে প্রবেশ ও প্রতিষ্ঠানিক ইমেল সুবিধা
৩০ জুন থেকে নোবিপ্রবিতে অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম চালু হয়, যা ১ অক্টোবর থেকে বর্জন করে নোবিপ্রবি শিক্ষক সমিতি ও ১৫ ডিসেম্বর থেকে তা পুনরায় চালু হয়। অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ‘কোর্সেরা’তে নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ফ্রিতে কোর্স করার ব্যবস্থা করা হয়। নোবিপ্রবির শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের জন্য ২০ অক্টোবর চালু করা হয় প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইল ও জি সুইট সুবিধা।
প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য
বছরে নোবিপ্রবি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ঝুলিতে ব্যাপক অর্জন জমা হয়েছে।প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পান নোবিপ্রবির ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের মো. মাহবুবুল আলম, এগ্রিকালচার বিভাগের সাবিয়া খান, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের আবু সাঈদ জাবেদ, অর্থনীতি বিভাগের হাবিবা সুলতানা। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত স্পিজনার অ্যান্ড স্কোপাসের ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্স প্রতিযোগিতা ও সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত ৮ম ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন কম্পিউটার অ্যান্ড কমিউনিকেশন ম্যানেজমেন্ট ২০২০ এ শ্রেষ্ঠ গবেষণা অ্যাওয়ার্ড পান নোবিপ্রবির ফলিত গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আহমেদ কাওছার।
নোবিপ্রবি অর্থনীতি বিভাগের আশরাফ উদ্দীন ও হৃদয় মজুমদার দেশব্যাপী আয়োজিত ‘বাজেট অলিম্পিয়াড-২০২০ ’ এর ফাইনাল রাউন্ডে টপ টেনে জায়গা করে নিয়ে পুরষ্কার জিতেন।
মানবতার কল্যাণে নোবিপ্রবি
করোনাকালীন অসহায় নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের সাহায্যে এগিয়ে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক, ছাত্র ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। করোনায় অসহায় মানুষের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে বেতন দান করে নোবিপ্রবি শিক্ষক সমিতি, নোবিপ্রবি অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। করোনা ও কিডনি রোগে আক্রান্ত নোবিপ্রবির ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সাইফ উদ্দিনের চিকিৎসায় পাশে এসে দাঁড়ায় নোবিপ্রবি প্রশাসন, শিক্ষক সমিতি ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। পর্বরতীতে চিকিৎসাধীন আবস্থায় মারা যায় মো. সাইফ উদ্দিন।
ফিরে দেখা ২০২০ সালে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকা সত্বেও বেশ কয়েকবার উত্তপ্ত হয়ে উঠে নোবিপ্রবি।
বিগত উপাচার্যের আমলে নোবিপ্রবির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল প্রকারের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়ায় আন্দোলনে নামে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। আন্দোলনের এক পর্যায় সকল প্রকারের ক্লাস- পরীক্ষা বর্জনে ঘোষনা দেয় শিক্ষক সমিতি। এতে করে বিপাকে পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ৭৫ দিনের টানা বর্জন কর্মসূচির পর ১৫ ডিসেম্বর উচ্চ মহলের আশ্বাসে ক্লাসে ফিরার ঘোষনা দেন শিক্ষকরা।
করোনাকালীন সময়ে মেসভাড়া সংকট নিয়ে কয়েকবার প্রশাসনের সাথে আলোচনার পরও কার্যকর ফলাফল না পেয়ে আন্দোলনে নামে নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা। ১৮ নভেম্বর নোয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভায় নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের মার্চ থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত মেস ভাড়ার ৪০ শতাংশ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে আলোচিত মাস হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকবে অক্টোবর মাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিপটের অবমাননা করায় ঐ মাসে সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হয় আইন বিভাগের এক শিক্ষার্থী। অক্টোবর মাসের শেষদিকে ইসলাম অবমাননার দায়ে নোবিপ্রবির দুই শিক্ষার্থীদের স্থায়ী বহিষ্কারের দাবীতে আন্দোলনে নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ঐ দুই শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে নোবিপ্রবি প্রশাসন।
নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. দিদার-উল-আলমকে নিয়ে টেলিভিশনে ও ফেসবুকে মিথ্যা বক্তব্যের ঘটনা ঘটে। নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. দিদার-উল-আলমকে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে স্বপরিবারে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়, এ ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে তিনি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন
বার্তাবাজার/পি