আট আনায় পুরি, এক টাকায় পেঁয়াজু

মানুষের কাছে এই দোকান যেন একটা ইতিহাস, যারা গল্প শুনেছেন, তারাও এসে অবাক হন, দোকান দেখে ফিরে যান যেন শায়েস্তা খাঁর আমলে…

ঢাকার কেরাণীগঞ্জের কলাতিয়া বাজারে আছে এমন একটি দোকান, যেখানে এক টাকা না, এরও অর্ধেক মূল্যের হিসাব হয়। একটি পুরির দাম সেখানে ৫০ পয়সা। আর পেঁয়াজু পাওয়া যায় এক টাকায়। এই সময়ে এসে আট আনা/পঞ্চাশ পয়শার কয়েন তো অচলই, তারউপর এক দুইটাকারও যেন আজকাল আর কোনো দাম নেই৷ ভিক্ষুকরাও এক টাকার কয়েন পেলে নাক সিঁটকায়৷

কেরানীগঞ্জের আটিবাজার থেকে ছয় কিলোমিটার ভেতরে এই কলাতিয়া বাজার। সেখানকার মানিক ভাণ্ডারি এক পরিচিত মুখ। তার দোকান ‘হোটেল মানিক ভাণ্ডার’-এ ভিড় থাকে নিত্য। আজ থেকে ২৫ বছর আগে মানিকের বাবা ফইজউদ্দিন মিয়া নিত্যপণ্যের ব্যবসা করতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর রাজধানী নাখালপাড়ার এক পুরি-পেঁয়াজুর কারিগরের পরামর্শে মানিক চালু করেন তার দোকানটি। এই ২৫ বছরে দেশ পাল্টে গেছে অনেক। কিন্তু পাল্টায়নি মানিকের পুরির দাম। শুরু থেকেই ৫০ পয়সা। মানিক প্রতিদিন পুড়ি বিক্রি করেন পাঁচ কেজি ময়দার। ভেতরে দেয়া থাকে আলু ও ডালের মিশ্রণ। পেঁয়াজু তৈরি হয় শীল-পাটায় বাটা খেসারির ডাল ও দেশি পেঁয়াজ কুচি দিয়ে।

মানিক ভান্ডারী জানান, পেঁয়াজের দাম যখন ২০০ টাকা তখনো তিনি দেশী পেঁয়াজেই পেঁয়াজু বিক্রি করেছেন। দিনে দিনে ৩০০ টাকার দোকান ভাড়া বেড়ে হয়েছে ২৫০০ টাকা , কর্মচারীর মাসিক ৫০০ টাকার বেতন এখন দৈনিক খরচ। দৈনিক, যুগের বিবর্তনে কাঁচামালের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু পুরির দাম আজও ৫০ পয়সাতেই আটকে রেখেছেন তিনি । যুগের সাথে নিজের ঐতিহ্যকে বাচিয়ে রাখার জন্য শুধু আকৃতির পরিবর্তন করেছে মাত্র কিন্তু দাম বাড়াননি।

এতো কম দামে বিক্রি করে পোষায় নাকি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ আমার দোকানে বেঁচা-কেনা ভালো। সকালে ডাল-পরোটা এবং বিকেলে পুরি-পেঁয়াজু বিক্রি হয় দোকানে। দোকানে একজন কর্মচারী ছাড়াও আমার ছোট ছেলে কাজে সহায়তা করে। আট আনার পুরির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে চারো দিকে। প্রতিদিনই বাড়ছে অচেনা ক্রেতার সংখ্যা। ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলেও আশা করি ছোট ছেলেই আমার ব্যবসাটা ধরে রাখবে।

লালবাগ থেকে আসা শাওন আহম্মেদ বলেন, কেরাণীগঞ্জে বসবাস করেন তার এক বন্ধুর কাছে শুনে আরও চার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এই পুরির স্বাদ নিতে এসেছি। খেয়ে ভালোই লাগছে। সরিষা বাটা, ধনে পাতা, কাঁচামরিচ, দই, তেঁতুল, চিনি মিশ্রিত টকের সাথে সালাদটাও দারুন লেগেছে।

লক্ষ্মীবাজার থেকে আসা জয় দেব বলেন, ৫০ পয়সা যেখানে ফকিরও নেয় না। এমনকি ব্যাংকও নিতে চায় না সেখানে পঞ্চাশ পয়সায় পুরি! ভাবাই যায়না। খেয়ে ভালো লেগেছে। তাই বাসার জন্যও নিয়ে নিলাম।

এই দোকানে ১১ বছর বয়স থেকেই কারিগরের কাজ করেন মিলন মিয়া। এখন তার বয়স ৩১ বছর। মাঝের চারটি বছর তার কেটেছে লেবাননে। আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে ৫০০ টাকা বেতনে কাজ শুরু করেছেন। এখন দিনেই পান এই পরিমাণ পারিশ্রমিক। মিলন মিয়া বলেন, ‘মানিক ভাণ্ডারি শুধুমাত্র আমার মহাজন না, সে আমার বড় ভাইয়ের মত। আমার পরিবারের অবস্থা দেখে সে আমাকে কাজ দিয়েছিলেন। লেবানন থেকে ফেরার পরেও সে আমাকে আবার কাজ দিয়েছে।’

বার্তাবাজার/পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর