সিরাজগঞ্জে কমছে অপরাধ, বাড়ছে পুলিশের প্রতি আস্থা

কৃষির পাশাপাশি শিল্প সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে সুপরিচিত সিরাজগঞ্জ। তাই দ্রুত গতিতে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে এ জেলা, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েই যাচ্ছিলো নানা ধরনের অপরাধ প্রবণতা।

এ জেলার আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে সব সময় চ্যালেঞ্জের মধ্যেই থাকতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশ বিভাগকে। গত এক দশকে পুলিশের ব্যাপক তৎপরতায় অপরাধের সংখ্যা কমে আসলেও তা ততোটা সন্তোষজনক ছিলো না। কিন্তু ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জে পুলিশ সুপার হিসেবে হাসিবুল আলম (বিপিএম) যোগদানের পর থেকেই তার যোগ্যতা, দক্ষতা ও বিচক্ষনতায় পাল্টে যাচ্ছে জেলার সবগুলো থানার চিরচেনা চিত্র।

অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, দুর্ণীতি, অনিয়মসহ সামাজিক অবক্ষয়। এখন হয়রানির বদলে সেবা প্রত্যাশীরা থানায় গিয়ে হচ্ছেন আপ্যায়িত, পাচ্ছেন যথাযথ সম্মান। সেই সাথে করোনা বিস্তাররোধে পুলিশ বাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রম সিরাজগঞ্জবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। আর এসব অর্জনের নেপথ্যে প্রধান কারিগর হিসেবে নিরলসভাবে কাজে করে যাচ্ছেন পুলিশ সুপার। তবে, নতুন প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য সিরাজগঞ্জ গড়ে তুলতে পুলিশের কাছে আরো ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন তারা।

সম্প্রতি বার্তা বাজার’র সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ নানা বিষয়ে কথা হয় পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম (বিপিএম) এর সাথে।

এসময় তিনি জানান, তিনি যোগদানের পরে বন্ধ করা হয়েছে জেলার সড়ক ও মহাসড়কে বিভিন্ন যানবাহন থেকে চাঁদাবাজি। সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা যাচাই বাছাই করে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। সেই সাথে কিশোর গ্যাং ও ক্রিকেট জুয়া বন্ধে বাড়ানো হয়েছে পুলিশী তৎপরতা।

থানায় দালাল চক্রের দৈৗরাত্ম্য বন্ধ করা হয়েছে। এখন মানুষকে থানায় গিয়ে হয়রানি বা কোন টাকা পয়সাও খরচ করতে হয়না। সাচ্ছন্দে বিনা খরচে মামলা ও জিডি গ্রহণ হয়। চা-বিস্কুট বা লজেন্স দিয়ে আপ্যায়িত করা হয় সেবা প্রত্যাশীদের। শুধু তাই নয় থানায় মামলা বা জিডি করলে অভিযোগকারিকে এখন আর তথ্য পাওয়ার জন্য থানায় ঘুড়তে হয়না। জেলার ১২টি থানার ডিউটি অফিসারের সরকারি নম্বর থেকে অভিযোগকারীর মোবাইলে চলে যায় এসএমএসের (ক্ষুদেবার্তা) মাধ্যমে তদন্তকারী কর্মকর্তার নাম ও মোবাইল নম্বরসহ যাবতীয় তথ্য। এছাড়াও ফিটনেস ও লাইসেন্সবিহীন যান চলাচল বন্ধ ও সড়ক দুর্ঘটনারোধে দৃঢ়তার সাথে কাজ করে যাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ।

তিনি আরও জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের ২০তারিখ পর্যন্ত জেলায় সর্বমোট ৩ হাজার ২৭৫ আসামীকে গ্রেফতার করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে পরোয়ানাভূক্ত ১ হাজার ১৭৫ জন, ৫’শ ৫৫ টি মাদক মামলায় ৬’শ ৯৭ জন, ৮ টি অস্ত্র মামলায় চরমপন্থীসহ ১০ জন এবং ১ হাজার ৩৯৩ জন নিয়মিত মামলার আসামীকে গ্রেফতার হয়। উদ্ধার করা হয় ১৮ হাজার পিস ইয়াবা, ১’শ ৯০ লিটার চোলাই মদ, ৪ হাজার ৫’শ বোতল ফেনসিডিল, ২শ’ লিটার বেয়ার, ১হাজার ২শ’ মিলিলিটার এ্যালকোহল, নেশা জাতীয় ইনজেকশন ৪৪ এ্যাম্পল, ৫৪ কেজি গাঁজা, ৫০ কেজি ওজনের ৯টি গাজার গাছ ও ২ কেজি হেরোইন। এছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে ৪ টি বিদেশী পিস্তল, ১৪ টি পাইপ গান, ৩ টি ওয়ান সুটার গান, ৭টি ম্যাগজিনসহ ২৩ রাউন্ড গুলি। এছাড়া মানুষকে করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদে রাখতে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে আমি (পুলিশ সুপার) আমার স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে করোনা আক্রান্ত হই। এছাড়া, জেলার ১৩২জন পুলিশ সদস্য করোনা আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে ফজলুর রহমান নামে একজন কোর্ট ইনসপেক্টর মারা যান। করোনাজয়ী ২৮জন পুলিশ সদস্য করোনা আক্রান্তদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে প্লাজমা প্রদান করেন।

৫ ডিসেম্বর শনিবার সদর থানায় সেবা নিতে আসা বেড়াবাড়ি গ্রামের (ব্রহ্মখোলা পূর্বপাড়া) আব্দুল আলিম জানান, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ বিষয়ে অভিযোগ দিতে এসেছিলাম। ডিউটি অফিসার আমার কথা শুনে খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি অভিযোগ জমা নিয়ে চা দিয়ে আপ্যায়ন করেছেন। শুধু তাই নয় আমার অভিযোগটি কোন তদন্তকারী কর্মকর্তা দেখবেন তা নাকি আমার ফোন নম্বরে এসএমএস দিয়ে জানানোও হবে। ৭ ডিসেম্বর সোমবার রায়গঞ্জ থানায় মারামারি সংক্রান্ত মামলা করতে আসা পাঙ্গাসী ইউনিয়নের মানব চন্দ্র রাজবংশী বলেন, মামলা করতে কোন টাকা লাগেনি। মামলার পর পুলিশ আসামীদের গ্রেফতারে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

সিরাজগঞ্জ সদর থানার ওসি বাহাউদ্দিন ফারুকী, রায়গঞ্জ থানার ওসি শহিদুল ইসলাম ও কামারখন্দ থানার ওসি রফিকুল ইসলাম পুলিশ সুপারের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, তিনি বাংলাদেশ পুলিশের একজন মেধাবী এবং চৌকস কর্মকর্তা। তার নির্দেশে আমরা সার্বিক অপরাধ দমনে কাজ করে যাচ্ছি। সেই সাথে পুলিশী সেবা মানুষের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে বিট পুলিশিং কাজ করে যাচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক জিহাদ আল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, পুলিশ সুপারের যোগদানের পর তার দক্ষতা, যোগ্যতা ও বিচক্ষনা দিয়ে পাড়া-মহল্লা বা গ্রামে গ্রামে মারামারির মতো সামাজিক অবক্ষয় নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। তার সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণে অন্যান্য জেলার চেয়ে সিরাজগঞ্জে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা হলেও কম। তাছাড়া রাজনৈতিক বিষয়েও নিরপেক্ষার সাথে দায়িত্ব পালন করে তিনি চা ল্যকর ছাত্রনেতা বিজয় হত্যা মামলার প্রধান আসামীসহ অন্যদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করতে সক্ষম হন।

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি হেলাল আহমেদ বলেন, পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম সিরাজগঞ্জে যোগদানের পর আগের চেয়ে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের দিন দিন আস্থা ও বিশ্বাস বাড়ছে। পুলিশের প্রতি যে অনীহা ছিল, সেটি এখন আর নেই বললেই চলে। এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু ইউসুফ সূর্য্য বলেন, পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম যোগদানের পর তার কর্মতৎপরতা মাধ্যমে ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’ এই শ্লোগাণটির সত্যতা প্রমান করেছেন। কেননা বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্বিম পাড়ে এ জেলা হওয়ায় সিরাজগঞ্জ শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে কারণে জেলার আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে সব সময় চ্যালেঞ্জের মধ্যেই থাকতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশকে। সর্বপরি সিরাজগঞ্জে পুলিশের স্বচ্ছ ভূমিকা সাধারণ মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে।

বার্তাবাজার/পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর