ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে তৈরী হচ্ছে খেজুরের রস-গুড়

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নারগুন ইউনিয়নের বোচাপুুকুর এলাকায় সুগার মিলের খেজুর বাগানের গাছ থেকে খেজুরের রস সংগ্রহ করে প্রাকৃতিক পরিবেশে গাছিরা তৈরী করছে গুড়।

ইতিমধ্যে খেজুরের রস ও রস দিয়ে তৈরীকৃত গুড় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বেশ। প্রাকৃতিক পরিবেশে গুড় তৈরীর দৃশ্য দেখতে, রস ও গুড় নিতে স্থানীয়রা সহ বিভিন্ন জেলা থেকে আগত শত শত ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন এখানে। রসের স্বল্পতার কারণে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন হচ্ছে না গুড়।

ঠাকুরগাঁও সুগার মিলের মোহন ইক্ষু খামারের পার্শ্বে খেজুর বাগানটি মিল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রাজশাহী জেলা থেকে আসা ৭ জন গাছি ২২ হাজার টাকায় লিজ নেয়। সর্বসাকুল্লে গাছিরা বাগানে খরচ করে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। বাগনে মোট ৭’শ খেজুর গাছের মধ্যে প্রতিদিন ৪’শ গাছ থেকে গড়ে ৫’শ লিটার রস সংগ্রহ করা হয়। এতে গড়ে ১২০ কেজি করে গুড় তৈরী হচ্ছে। গুড় ও রস বিক্রয় করে গাছিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

ছবি-বার্তাবাজার

শীত প্রকোপ বাড়তে থাকার সাথে সাথে এরই সঙ্গে খেজুর রস সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিয়েছেন নারগুন ইউনিয়নের বোচাপুুকুরের গাছিরা। পর্যাপ্ত গাছ থাকায় বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও চাহিদা অনুযায়ী রস পাওয়া যাবে বলে আশঙ্কা অনেক গাছিরা। এক বছর আগেও বোচাপুুকুর এলাকায় তেমন খেজুর গাছের দেখা মিলতো না।

খেজুর গাছ ৮ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত রস দেয়। শীতের পুরো মৌসুমে চলে রস, গুড়, পিঠা, পুলি ও পায়েস খাওয়ার পালা। এছাড়া খেজুর পাতা দিয়ে আর্কষণীয় ও মজবুত পাটি তৈরি হয়। এমনকি জ্বালানি কাজেও ব্যাপক ব্যবহার হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, কালের বির্বতনসহ বন বিভাগের নজরদারি না থাকায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব খেজুর গাছ এখন বিলুপ্তির পথে।

খেজুর গাছ সাধারণত উপযোগী আবহাওয়ায় জন্মে। প্রতি বছরে ৪ মাস খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। এ রস অত্যন্ত সুস্বাদু ও মানবদেহের উপকারিতার কারণে মানুষের কাছে অতি জনপ্রিয়। শীতকালে শহর থেকে মানুষ ছুটে আসছে গ্রামবাংলার খেজুর রস খেতে। রস আহরণকারী গাছিদের প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায় সে সময়। রস জ্বালিয়ে পাতলা ঝোলা, দানা গুড় ও পাটালি গুড় তৈরি করছে সদর উপজেলার নারগুন ইউনিয়নের খেজুর গাছিরা।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নারগুন ইউনিয়নের বোচাপুুকুর এলাকার মোঃ আবদুল্লাহ্ হক। করেন কৃষিকাজ আর রয়েছে একটি দোকান। ৭ জন গাছি নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেন। বলেন, বছখানেক আগে আমি কাজ শুরু করি। শীতের মৌসুমে প্রতিদিন ভোর থেকে খেজুরের হাড়ি সংগ্রহ থেকে শুরু করে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করা হয়। সকাল থেকে দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন আসে আমাদের কাজ দেখতে। তারা ছবি তোলে, কথা বলে। ভালোই লাগে আমাদের।

গাছি সুজন আলী জানান, প্রাকৃতিকভাবে ও নির্ভেজাল গুড় তৈরী করায় এখানকার গুড় ও রসের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। তাদেরকে বাজারে নিয়ে গুড় বিক্রয় করার প্রয়োজন হয় না। সরেজমিনে এসে ক্রেতারা রস ও গুড় ক্রয় করে নিয়ে যায়। অনেকে এক সপ্তাহ আগেই রস ও গুড় নেওয়ার জন্য অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখলেও তাদের আমরা ঠিকভাবে রস ও গুড় দিতে পারছি না। গাছ থেকে রস কম উৎপাদন হওয়ার কারণে ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সুজন আলী আরও বলেন, শীত মৌসুমের শুরুতেই আমরা খেজুর গাছের রস সংগ্রহের কাজ করে থাকি। কাঁচা রস বিক্রির পাশাপাশি এই রস থেকে পাটালি ও ঝোলা গুড় তৈরি করি। যা এখানেই পাইকারি এবং বাদবাকি বাজার বিক্রি করে থাকি।

খেজুরের রস-গুড় বিক্রির দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা বলেন, শীত মৌসুমে খেজুর গাছের রস, গুড়, পাটালির চাহিদা থাকে। তবে গাছে রসের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ায় দাম থাকে একটু চড়া। তবু্ও এর স্বাদ নিতে ভুল করেন না সকল শ্রেণির মানুষ। বর্তমানে এখানে এক লিটার খেজুর রস ৫০ টাকা দরে ও এক কেজি গুড় ১’শ ৫০ টাকা দরে বিক্রয় করা হচ্ছে।

প্রতিদিন তার এই খেজুর বাগানের রস ও গুড় খেতে, কিনতে ভোর থেকে ভীড় জমান দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা। সকাল ৬ টা থেকে ৮ টা পর্যন্ত এই রস ও গুড় টাটকা পাওয়া যায় বিধায় এই সময়ে বহু মানুষের সমাগম ঘটে। সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে তার রস ও গড় প্রক্রিয়াজাতকরণ অংশে তিল ধারণের ঠাই থাকেনা।

বাগানে খেজুরের রস ও গুড় কিনতে আসা কয়েকজন ক্রেতা জানান, প্রাকৃতিকভাবে ও ভেজাল মুক্ত হওয়ায় এখানকার রস ও গুড় অনেক সু-স্বাদু তাই এর চাহিদা অনেক বেশি।

বর্তমানে যে হারে খেজুর গাছ হারিয়ে যেতে বসেছে হয়তোবা এক সময় খেজুর গাছ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাই এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সবার উচিৎ তালগাছের মতো বেশি করে খেজুর গাছ লাগানো এবং তা যত্ন সহকারে বড় করা। আমাদের হাজার বছরের এই ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের জন্য ধরে রাখতে হলে এই কাজে সবার এগিয়ে আসতে হবে।

বার্তাবাজার/পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর