শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস: আমাদের মেধাহীন করার ব্যর্থ অভিপ্রায়

আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। পৃথিবীর বুকে যখন বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উত্থান শুরু হতে যাচ্ছে তখন পাকিস্তানি হানাদারদের সাথে মিলে তাদের দোসর আল-বদর, রাজাকার, আল-শামস বাহিনী দেশের বুদ্ধিজীবীদের শেষ করে জাতিকে মেধাশূন্য করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। হত্যা করা হয় দেশের প্রতিভাবান অনেক মানুষকে।

ওইদিন দেশের অসংখ্য শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কবি-সাহিত্যিক ও সাংবাদিককে চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নির্যাতনের পর হত্যা করে। পরবর্তীতে ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে গণকবরে তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। দেশ চুড়ান্তভাবে স্বাধীন হওয়ার পর শহীদদের স্বজনরা গিয়ে তাদের মরদেহ শনাক্ত করে।

তখন মিরপুরে পাওয়া মরদেহে দেখা যায় অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। কারো গায়ে গুলি, কারও চোখ উপরে ফেলা হয়েছে । এমনকি অনেককে ধারালো অস্ত্র দিয়েও জবাই করা হয়। যার মাধ্যমে জানা যায় তাদেরকে হত্যার পূর্বে কতটা ভয়াবহভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বিভিন্ন সংকলন, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংবাদ এবং সংবাদ বিচিত্রা ‘নিউজ উইক’র সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের পরিসংখ্যান গবেষণা করে জানা যায়, সেদিন দেশের ১ হাজার ৭০ জনের মত অমূল্য রত্নকে ওরা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস থেমে ছিল না বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করার কাজ। তবে নীল নকশা অংকন করে দেশ স্বাধীন হওয়ার অন্তিম মুহুর্তে একরাতেই হত্যা করা হয় অগণিত বুদ্ধিজীবী। পরাজিত শক্তির পরিকল্পনা ছিল, যেন এই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও মেধার অভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে। কারণ তারাও জানতো দেশের এই বুদ্ধিজীবীদের বাঁচিয়ে রাখলে বেশীদিন লাগবে না জাতি হিসাবে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে সগৌরবে দাপিয়ে বেড়াতে।

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ১৪ ডিসেম্বরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করে দিনটিকে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র দু’দিন পরে ১৮ ডিসেম্বর বেসরকারিভাবে গঠন করা হয় বুদ্ধিজীবী নিধন তদন্ত কমিটি। যার প্রতিবেদন অজ্ঞাত কারণে আর প্রকাশিত হয়নি।

এরপর গঠিত হয় ‘বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটি’। এই কমিটির প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, পাকিস্তানী সেনা অফিসার রাও ফরমান আলীর পরিকল্পনা ছিল দেশের ২০ হাজার বুদ্ধিজীবীকে শেষ করে দিয়ে দেশকে পুরোপুরি মেধাশূণ্য করার। কিন্তু তার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি সফল হয়নি। কারণ সে চেয়েছিল এইসব বুদ্ধিজীবীকে গভর্নর হাউজে আমন্ত্রণ জানিয়ে ভয়াবহতার চুড়ান্ত করে হত্যা করার।

এই কমিটির প্রধান ছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের ভাই নামকরা চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাহিত্যিক জহির রায়হান। তিনি বলেছিলেন, এরা নির্ভুলভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনষ্ক বুদ্ধিজীবীদেরকে বাছাই করে আঘাত হেনেছে’। রহস্যজনকভাবে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে তিনিও নিখোঁজ হয়ে যান। আর ফিরেননি।

১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর তখনকার সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক আজাদের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীদের হত্যার যে পরিকল্পনাটি করা হয়েছিল তা বেশ আগের। এই পরিকল্পনা বানাতে পাকিস্তানীদের সহযোগিতা করে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রসংঘ।

নির্মম এই হত্যাযজ্ঞে সবেচেয় বেশি সক্রিয়দের নাম বললে ধারাবাহিকভাবে যাদের নাম আসে তারা হলো- ব্রি. জে. আসলাম, ক্যাপ্টেন তারেক, কর্ণেল তাজ, কর্ণেল তাহের, ভিসি প্রফেসর ডঃ সৈয়দ সাজ্জাদ হোসইন, ডঃ মোহর আলী, আল বদরের এবিএম খালেক মজুমদার, আশরাফুজ্জামান ও চৌধুরী মাইনুদ্দিন। আর তাদের নেতা হসিয়াবে কাজ করেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী।

তবে জাতির এত বড় ক্ষতি হওয়ার পরেও দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে কেউ মামলা দায়ের করেনি। অজ্ঞাত কারণে আইনের ছায়ায় যায়নি শহীদদের আত্মা। ১৯৯৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিনের বোন ফরিদা বানু নারকীয় এই ঘটনায় রাজধানীর রমনা থানায় মামলা দায়ের করেন। ১৫ নং সিরিয়ালধারী এই মামলায় আসামি করা হয় আলবদর বাহিনীর চৌধুরী মাইনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানকে।

১৯৭১ সালে স্থপতি মোস্তাফা হালি কুদ্দুস শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরনে রাজধানীর মিরপুরে প্রথমবারের মত একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। পরে বিএনপি সরকারের আমলে রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকায় জামী-আল সাফী ও ফরিদউদ্দিন আহমেদের নকশায় আরও একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৯৯ সালের বুদ্ধিজীবী দিবসে এটির উদ্ভোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বার্তাবাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর