সমাজপতিদের দলাদলিতে দুই ভাই খুন, গ্রাম ছাড়া ৪৫ পরিবার

দিনে দিনে সমাজপতিদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলছে। তাদের উসকানিতে যেকোন তুচ্ছ ঘটনায় দুটি পক্ষ তৈরি করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন সাধারণ জনগন। এতে একদিকে যেমন হানাহানি খুনোখুনি হচ্ছে, তেমনি অপরদিকে ঘরবাড়ী ভাংচুর ও লুটপাটে সহায়- সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন নিরীহ জনগন। তবে মাঝখানে লাভবান হচ্ছেন সমাজপতিরা।

এমনই এক অনাকঙ্খিত ও নেক্কারজনত ঘটনা ঘটেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের পাহাড়পুর গ্রামে। সেখানে প্রায় ৯ মাস আগে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সমাজপতিদের উসকানিতে তুচ্ছ ঘটনা ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে দুইগ্রুপের সংঘর্ষে নেহেদ আলী (৬৫) ও বকুল আলী (৫৫) নামের আপন দুই ভাই খুন হয়।

এঘটনায় নিহত নেহেদ আলীর ছেলে নুরুল ইসলাম বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ০১, তাং-০১/০৪/২০২০। মামলা রুজু হওয়ার পরে পুলিশ আসামীদের গ্রেফতারপূর্বক আদালতে সোপার্দ করেন। বর্তমানে মামলাটি কুষ্টিয়া কোর্টে চলমান রয়েছে।

ঘটনার আইনী প্রক্রিয়াদি চলমান থাকলেও থেমে নেই বাদী পক্ষের অন্যায় অবিচার, নির্মম অত্যাচার ও আচরণ। তাদের অসাধু আচরণে একে একে প্রায় ৪৫ টি গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সেই সুযোগে ইট পাথরের তৈরি পাকা বাড়ি থেকে শুরু করে সকল স্থাপনাদি ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে ঘরে থাকা সকল প্রকার আসবাবপত্র, কৃষি ফসলাদি, গৃহপালিত পশু- পাখি, সোনার গহনা, নগদ টাকা সহ যাবতীয় সামগ্রী লুটপাট করে নিয়েছে তারা। শুধু তাই নয়, দিনে দিনে ভাঙা ঘরের ইট কাঠ পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছে বাদী পক্ষের লোকজন। এরপরেও থেমে নেই তারা, বর্তমানে বড় বড় কাঠের বাগানসহ সকল গাছ ও বাঁশ কাঁটা বেচার উৎসব চলছে এলাকায়। আর এর সবকিছুই পুলিশের সহযোগীতায় হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

পুলিশ, নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ মার্চ সোমবার দুপুরে পাহাড়পুর ঈদগা মাঠে ক্রিকেট খেলা নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটলে স্থানীয় বাঁধবাজার পুলিশ ক্যাম্পে উভয়ের মধ্যে সালিশ বৈঠক হয়। পরে সালিস থেকে বাঁধবাজারে এসে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের সমর্থিত লোকজন চাপড়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড মেম্বার ফিরোজুর আহমেদ কটার অফিসের সামনে এসে তাকে বকা-বাধ্য করে। এতে উভয়ের মধ্যে পুনরায় হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে ৩১ মার্চ সন্ধায় পাহাড়পুর গ্রামের মৃত চাঁদ আলীর ছেলে নেহেদ আলী ও বকুল আলী কোমলাপুর বাজার থেকে বাড়ী যাওয়ার পথিমধ্যে দক্ষিণ পাহাড়পুর গ্রামের মিন্টুর বাড়ীর কাছে পৌঁছালে পূর্ব থেকে ওৎ পেতে থাকা একই গ্রামের ভুট্টো, তরুণ, শিশির, শাহজাহানসহ ১০/১২ জন তাদের কুপিয়ে গুরুতর জখম করে পালিয়ে গেলে ঘটনাস্থলে নেহেদ মারা যায় এবং বকুল হাসপাতালে মারা যায়। এসময় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে এলাকায় পুলিশ মেতায়েন করা হয়। এরপর ঘটনার পরদিন নিহতের ছেলে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে কিছু আসামী ধরতে স্বক্ষম হয় ও ধৃতদের আদালতে সোপার্দ করে পুলিশ এবং পরবর্তীতে আসামীরা জামিন নিয়ে এলাকায় প্রাণ ভয়ে না ফিরে বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনদের বাড়ীতে আশ্রয় নেন। কেউবা জেলার বাইরে চলে যায়।

এবিষয়ে নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক ভুক্তভোগী বলেন, তুচ্ছ ঘটনায় এলাকাতে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক।আমরাও চাই প্রকৃত দোষীদের বিচার হোক।কিন্তু যারা নিরপরাধ, নির্দোষ, তারা কেন মামলার আসামী হবে, ভোগান্তি পোহাবে, এলাকা ছাড়া হবে। তারা আরো বলেন, একজন অপরাধ করতে পারে, কিন্তু তার পরিবারের সদস্যরা তো অপরাধী নয়, ঘরবাড়ী, দালানকোঠা, পশুপাখি, গাছপালা, বাড়ীর আসবাব পত্র তো অপরাধী নয়।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে আরেকজন বলেন, দুই ভাই খুনের ঘটনায় পাহাড়পুর গ্রামের প্রায় ৪৫ টি পরিবার গ্রাম ছাড়া হয়েছে। এদের ঘরবাড়ী ভাংচুর করে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে প্রতিক্ষরা।গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী, গাছ গাছালি, কৃষি ফসল, সোনাদানা লুটপাট সহ কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

জানা গেছে, মামলার অন্যতম আসামী ওই এলাকার নয়ন মন্ডলের ছেলে আব্দুল আলীম মাস্টার। তার এক তালা বিল্ডিং বাড়ী ছিল।পরিবারে শিক্ষার্থী ছিল তিনজন। বর্তমানে সাদা ভিটা ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়না। সব মিলে তার ক্ষয় ক্ষতির পরিমান প্রায় ৮ লাখ টাকা। খলিল মাস্টারে পাকা বাড়ীটিও বর্তামানে মাটির সাথে মিশে রয়েছে। তার ক্ষয় ক্ষতির পরিমান ৫/৭ লাখ টাকা।

মামলার ১৬ নং আসামি গোলাম মোস্তফা। গ্রামে একটি পাকা বাড়ী ছিল তার। সেই বাড়ীটিও মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে প্রতিপক্ষরা। অথচ এক সময় বাড়ীতে ১ টা গাড়ী, পাওয়ার টিলার ১ টা, ভুট্টো মাড়াই মোশিন ১ টা, নগদ ২৫ হাজার টাকা, দেড় ভরি স্বর্ণালংকার, ফার্নিচার, টেলিভিশন, পিয়াজ ৫০/৬০ মন, ভুট্টা ১০০/১৫০ মন ও একটি পাকা বাড়ী ৫ রুমের আনুমানিক ১০/১২ শতাংশ জমির উপর, গাছপালা, বৈদ্যিতিক মিটার ছিল। সবকিছু এখন যেন স্মৃতির পাতায় কড়া নাড়া দেয়। তারও ক্ষয় ক্ষতির পরিমান ১০/১২ লাখ। ঘটনায় জড়িত না হলেও আসামী হয়েছেন রুস্তম আলী। বয়স-৬৫ বছর। শারীরিকভাবে অসুস্থ তিনি।

তার ২ ছেলে ঢাকা চাকুরী করেন এবং মেয়েটি সরকারী মহিলা কলেজের মাষ্টাসের ছাত্রী।তারও বাড়ীতে পাকা ঘর ছিল। সেখানে ১ টা পানির ট্যাংক, মটর ১ টা, নগদ ৫২ হাজার টাকা, গহনা ২.৫ ভরি, ফার্নিচার, টেলিভিশন, পিয়াজ ৫/৬ মন, ভুট্টা ৪০/৫০ মন ও ৫ রুমের একটি পাকা বাড়ী ছিল পাহাড়পুর গ্রামে। সবই মাটিতে মিশে গেছে। আনুমানিক ১০/১২ শতাংশ জমির উপর, গাছপালা, বৈদ্যিতিক মিটার, দরজা ৭ টা, জানালা ৬ টা, খাট ২ টা, আলমারি ২ টা, সোকেস ১ টা, সহ অন্যান্য আসবারপত্র, জমির মূল্যবান দলিল পত্র, সার্টিফিকেট ইত্যাদি ছিল।কিন্তু বর্তমানে সব স্মৃতির পাতায় রয়ে গেছে। বাদী পক্ষের অসৎ আচরণে তার ক্ষয় ক্ষতির পরিমান ৮/১০ লাখ (আনুমানিক)। এছাড়াও ৪৫ টি পরিবারে সবমিলে কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে।

এবিষয়ে মামলার ১১ নম্বর আসামী আলমগীর মুঠোফোনে বলেন, আমি একটি কোম্পানিতে চাকুরি করি। ঘটনার সময় এলাকার বাইরে ছিলাম। ঘটনার সাথে কোনভাবেই আমি জড়িত নয়। তবুও আসামী হয়েছি। শুধু তাই নয়, আমার ২ টা আধাপাকা ঘর, একটা রান্না ও একটা পাকা গোয়াল ঘর ছিল, সবই মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে ওরা। লুটপাট করেছে ঘরের টিভি, ফ্রিজ, কৃষি ফসল, আসবাবপত্র সহ সকল কিছু। তিনি আরো বলেন, প্রায় ২৫ বছর বয়সের ৪৫০ টি গাছের একটি মেহগনি বাগান ছিল। সেখানে মোটা অংকের কাঠের গাছ ছিল।সবই কেটে নেছে ওরা। এতকিছুর পরেও কেন আইনের আশ্রয় নেওয়া হয়নি? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আসলে সব কিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন আছি, অভাব অনাটনে দিন যাচ্ছে। কয়েকটি মামলা করেছিল, কিন্তু কোন ফল হয়নি। বাবুল নামের একজন বলেন, ঘটনা যাইহোক তার জন্য প্রচলিত আইনে বিচার হোক, কিন্তু ঘটনার পরবর্তী কার্যক্রম তো আরো একটি ঘটনার জন্ম দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমরা আবার এলাকায় ফিরতে চাই।

কেন এমন নির্মম বর্বরতা? জানতে চাইলে নিহতের ভাই আরিফ মুঠোফোনে বলেন, কে বা কারা একাজ করছে জানিনা। তবে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নিতে পারে। তিনি আরো বলেন, আমরা দেখতে গেলেও সমস্যা, নিষেধ করলেও সমস্যা। নাম প্রকাশ না করা শর্তে বাদী পক্ষের একজন বলেন, ক্ষোভে আমরা ভাংচুর করেছি, তবে লুটপাট করিনি।

এ বিষয়ে কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান বলেন, দুই ভাই খুনের ঘটনায় মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে ভাংচুর লুটপাটের ঘটনা আমার জানা নেই, কোন পুলিশ সদস্য জড়িত নেই। এঘটনায় কোন লিখিত অভিযোগও পাওয়া যায়নি।

বার্তাবাজার/পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর