আজ ১১ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর নান্দাইল থানা পাক হানাদার মুক্ত হয়। দিনটিকে নান্দাইলের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করছে।
যুদ্ধের পটভূমি
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী উভই পক্ষই সক্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহেই পাকিস্তানি বাহিনীকে আটকানোর জন্য মুশুল্লী উচ্চ বিদ্যালয়ে গোপনে মেজর খালেদ মোশাররফ ও এটিএম হায়দারের নেতৃত্বে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠকদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের কয়েকদিনের মধ্যে পরিকল্পনা মোতাবেক ডিনামাইট দিয়ে মুশুল্লী রেলওয়ে স্টেশনের দক্ষিণে অবস্থিত শুভখিলা রেলব্রিজ ধ্বসিয়ে দেওয়া হয়। এটিএম হায়দার এই অপারেশনের নেতৃত্ব দেন। ফলে কিশোরগঞ্জ থেকে রেলপথে ভারী অস্ত্রসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আসার পথ আপাতদৃষ্টিতে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কয়েকদিন পরেই কিশোরগঞ্জ থেকে পাকিস্তানি বাহিনী শুভখিলা রেলব্রিজ পর্যন্ত আসে এবং স্থানীয়দের নদী পারাপারের নৌকায় হালকা অস্ত্রসহ নান্দাইলে প্রবেশ করে।
অন্যদিকে সড়কপথে সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনীর আগমন ঠেকানোর জন্য ১৮ এপ্রিল নান্দাইল শহরের প্রবেশমুখে কিশোরগঞ্জ সড়কের অংশবিশেষ কেটে ট্রেঞ্চ তৈরি করা হয়। কিন্তু স্থানীয় দালালদের সহায়তায় আগেই খবর পেয়ে পাকবাহিনী সতর্ক হয়ে যায় এবং এ ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি শাহনেওয়াজ ভূঁইয়াসহ সাত জনের বিরুদ্ধে নান্দাইল থানায় মামলা করা হয়। ২১ এপ্রিল মেজর আশফাকের নেতৃত্বে পাকবাহিনী নান্দাইলে ঘাঁটি স্থাপন করে।
এই দিন রাজগাঁতী, শুভখিলা ও কালীগঞ্জ এলাকায় ১৮ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয় ও কয়েকশ বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নান্দাইল শহরের তিন-চার কিলোমিটার পূর্বে বারুইগ্রাম মাদ্রাসায় ক্যাম্প স্থাপন করে। স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নান্দাইল শহরের পার্শ্ববর্তী আমুদাবাদ গ্রামে আশ্রয় নেয় এবং স্থানীয় দালালদের সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নান্দাইলে ঘাঁটি স্থাপনের পর স্থানীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনী শুভখিলা রেলব্রিজের উভয় পাশে পাহারা বসায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনানুসারে, সন্ধ্যার পর সেনাবাহিনীর রিজার্ভ ট্রেনে গৌরীপুর ও ভৈরব থেকে সন্দেহভাজন মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের আত্মীয়দের ধরে এনে রেলব্রিজের নিচে দাঁড় করিয়ে হত্যা করতো। এছাড়াও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দমনের জন্য পাকিস্তানি বাহিনী স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরের সহায়তায় বারুইগ্রাম ক্যাম্পের পাশের ডাংরিবন্দ এলাকায় একটি পরিত্যক্ত ইটাখোলায় ২৫-৩০ জনকে হত্যা করে।
নান্দাইল যুদ্ধ
মুক্তিযোদ্ধারা গোপনে বৈঠক করে ১০ নভেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থানের ওপর হামলা চালানোর পরিকল্পনা করে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৭ নভেম্বর আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়।
১৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা চারটি দলে ভাগ হয়ে নান্দাইল থানা ঘিরে ফেলে। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পনা আগে থেকেই জেনে যায় এবং নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভ্রান্ত করে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণে অভিযান ব্যর্থ হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সাড়ে চার ঘণ্টার সম্মুখ যুদ্ধে ২৪ জন শহীদ হয়। অভিযানে ব্যর্থতার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি শাহনেওয়াজ ভূঁইয়াসহ কয়েকজনকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া চারিআনিপাড়া, গারুয়া, ধুরুয়া, শেরপুর, রাজগাঁতী, মুশুল্লী প্রভৃতি স্থানে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ করা হয়।
ইলিয়াস উদ্দিন ভূঁঁইয়া, শামসুল হক, জিল্লুল বাকি, শাহনেওয়াজ ভূঁঁইয়াসহ মোট ২৭ জন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ১৭ নভেম্বর শহীদ হন। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি বছর দিনটিকে “নান্দাইল শহীদ দিবস” হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে।
নান্দাইল মুক্তি
ডিসেম্বর মাসের প্রথম থেকে রণাঙ্গনে পাকবাহিনীর পরাজয়ে মনোবল কমিয়ে দেয়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা নতুন আক্রমণের পরিকল্পনা করে। ১০ ডিসেম্বর রাতে নান্দাইল শহরকে তিনদিক থেকে ঘিরে রাখা নরসুন্দা নদীকে কাজে লাগিয়ে কমান্ডার ফারুকের নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী থানা ঘেরাও করে পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। রাত দুইটার দিকে নান্দাইলে প্রথম বিজয়সূচক স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। তাই ১১ ডিসেম্বরকেই “নান্দাইল মুক্ত দিবস” হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তথ্যসূত্র-উইকিপিডিয়া।
বার্তাবাজার/এসজে