আজ ৩ ডিসেম্বর, ঠাকুরগাঁও পাক-হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ এর এই দিনে ঠাকুরগাঁও পাকিস্তানী হানাদার মুক্ত হয়। সেই সময় ঠাকুরগাঁও ছিল উত্তরের প্রত্যন্ত অঞ্চল দিনাজপুর জেলার একটি মহকুমা। বর্তমান ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড় জেলার ১০টি থানা ছিল ঠাকুরগাঁও মহকুমার অন্তর্গত।
’৭১ এর ২৭ মার্চ পাক বাহিনীর হাতে প্রথম শহীদ হয় রিক্সা চালক মোহাম্মদ আলী। পরদিন ২৮ মার্চ ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি উচ্চারণ করায় শিশু নরেশ চৌহানকে গুলি করে হত্যা করে পাকবাহিনীর সদস্যরা।
২৯ মার্চ ঠাকুরগাঁও ইপিআর এর সুবেদার কাজিম উদ্দিন সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করে হাবিলদার বদিউজ্জামানের সহায়তায় অস্ত্রাগারে হামলা চালায়। তারা সমস্ত অস্ত্র বাঙ্গালী সেনাদের হাতে তুলে দিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তার নির্দেশে পাকিন্তানী সেনা অফিসারদের গুলি করে হত্যা করা হয়। ফলে ব্যাটালিয়ান হেড কোয়ার্টার পুরোপুরি বাঙ্গালীদের দখলে চলে আসে। তখন থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রশাসন পরিচালিত হতে শুরু করে তৎকালীন সংসদ সদস্য আওয়ামী নেতা আলহাজ্ব ফজলুল করিমের নির্দেশে।
হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঠাকুরগাঁওবাসীর দুর্বার এই প্রতিরোধের কারণেই ১৪ই এপ্রিল পর্যন্ত হানাদার বাহিনী প্রবেশ করতে পারেনি ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে। ১৫ই এপ্রিল ১০টি ট্রাক ও ৮টি জিপে করে মুহুর্মুহু শেল বর্ষণ করতে করতে ঠাকুরগাঁও শহরে ঢুকে পড়ে হানাদার বাহিনী। তবে তেতুলিয়া থানাকে কেন্দ্র করে ১৫০ বর্গমাইলের ১টি মুক্তাঞ্চলকে কেন্দ্র করে গঠিত ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা সংগঠিত হয় এবং পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
২৩ এপ্রিল ভোরে পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়ে জগন্নাথপুর, চকহলদি, সিঙ্গিয়া, চন্ডিপুর, আলমপুর, বাসুদেবপুর, গৌরিপুর, মিলনপুর, খামারভোপলা, শুকানপুকুরীসহ বিভিন্ন গ্রামের কয়েক হাজার বাঙালি নর-নারী ও শিশু ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। তারা জাঠিভাঙ্গা এলাকায় পৌছালে এ দেশীয় দোসরদের সহযোগীতায় সেদিন পাক বাহিনী কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করে।
২৯ নভেম্বর পঞ্চগড় হাতছাড়া হওয়ার পর পাকবাহিনীর মনোবল ভেঙে গেলে তারা পিছু হটে ঠাকুরগাঁওয়ে ঘাঁটি স্থাপন করে। পাকসেনারা ৩০ নভেম্বর ভুল্লী ব্রিজটি বোমা মেড়ে উড়িয়ে দেয় এবং সালন্দর এলাকায় বিভিন্ন জায়গায় মাইন পেতে রাখে। মিত্রবাহিনী ভুল্লী ব্রিজ মেরামত করে ট্যাঙ্ক পারাপারের ব্যবস্থা করে। পরবর্তীতে কমান্ডার মাহাবুব আলমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা মাইন অপসারণ করলে মিত্রবাহিনী ঠাকুরগাঁও শহরের দিকে অগ্রসর হয়।

২ ডিসেম্বর রাতে প্রচণ্ড গোলাগুলি ও সম্মুখ যুদ্ধের পর শত্রুবাহিনী পিছু হটে ২৫ মাইল নামক স্থানে যায়। ৩ ডিসেম্বর ভোর রাতে মিত্রবাহিনী বিজয়ীর বেশে ঠাকুরগাঁওয়ে প্রবেশ করে। মুক্ত হয় ঠাকুরগাঁও।
এদিকে, উৎসবমূখর পরিবেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনব্যাপী নানান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আজ ঠাকুরগাঁওয়ে পাকিস্তানী হানাদার মুক্ত দিবস পালন করা হয়। এ উপলক্ষে জেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের আয়োজনে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলক চত্বরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, র্যালি, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে।
সকালে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় প্রাঙ্গণে সাবেক জেলা কমান্ডার বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ঠাকুরগাঁওয়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা বদরুদ্দোজা বদরের সভাপতিত্বে জাতীয় সংগীত পাঠ ও পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিবসটির উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সসদ্য ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম, পুলিশ সুপার মোহা: মনিরুজ্জামান পিপিএম, জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধারাসহ জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। উদ্বোধন শেষে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় থেকে র্যালী ও শোভা যাত্রা বের করে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ডাক বাংলোতে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও পুষ্পস্তবক অর্পন করেন।
অন্যদিকে, প্রতিবারের ন্যায় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ঠাকুরগাঁও জেলা সংসদের সভাপতি সেতারা বেগমের সভাপতিত্বে পাবলিক লাইব্রেরী মাঠ প্রাঙ্গণে জাতীয় সংগীত ও পতাকা উত্তোলন করে যান্ত্রিক শোভাযাত্রা ও র্যালি বের করে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ও বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন।
বার্তাবাজার/এসজে