আজ ৪৯ তম ঠাকুরগাঁও মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হয় এ জেলা। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয় ঠাকুরগাঁও। এই দিনে ঠাকুরগাঁও মহকুমায় মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াই আর মুক্তিকামী জনগণের দুর্বার প্রতিরোধের মুখে পতন হয় পাকবাহিনীর।
ঠাকুরগাঁও এলাকার সর্বত্রই পাকিস্তানীদের পতনের পর ছড়িয়ে পড়ে মুক্তির উল্লাস। লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা আর জয় বাংলার ধ্বনি শুনে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন তারা । উড়িয়েছিলেন স্বাধীন বাংলার পতাকা এই জেলার মাটিতে।
যে মানুষগুলোর আত্মত্যাগে দেশ শত্রুমুক্ত হয়েছিল তাদের স্মরণে হানাদার মুক্ত দিবসটি পালন উপলক্ষে দিনটিকে ঘিরে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ঠাকুরগাঁও জেলা ইউনিট কমান্ডের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সহযোগীতায় এসব কর্মসূচী পালন করা হবে।
কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে- ৩ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০ টায় বিজয় সভাযাত্রা, জেলার বঙ্গবন্ধু স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পমাল্য অর্পন, বিকেল ৩টায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা সভা, ৪টায় সঙ্গীতানুষ্ঠান, সাড়ে ৫টায় শহীদ জায়া ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান এবং সর্বশেষ আতশবাজী পোড়ানো ও রাত ১২ টা ১ মিনিটে শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনারে আলোক প্রজ্জোলন।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন এমপি।
উক্ত কর্মসূচীতে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ঠাকুরগাঁও জেলা ইউনিট কমান্ডের সাবেক জেলা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা বদরুদ্দোজা বদর জেলার সকল মুক্তিযোদ্ধা ও সর্বস্তরের মানুষকে অংশগ্রহণের আহবান জানিয়েছেন।
তবে দিবসটি পালনে সরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার দাবি মুক্তিযোদ্ধাসহ সবার।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকসেনারা। তাদের প্রতিরোধ করতে সারাদেশসহ ঠাকুরগাঁওবাসী গড়ে তুলেছিল দুর্বার আন্দোলন।
ঠাকুরগাঁও মহকুমা ছিল ৬ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। কমান্ডার ছিলেন পাক বাহিনীর স্কোয়াড্রেন লিডার খাদেমুল বাশার। সমগ্র সেক্টরে ১ হাজার ১২০টির মত গেরিলা বেইস গড়ে তোলা হয়। ৮ মে’র আগ পর্যন্ত সুবেদার কাজিম উদ্দিনের দায়িত্বে ছিলেন। ৯ মে ক্যাপ্টেন নজরুল, কাজিম উদ্দিনের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে স্কোয়াড্রেন সদরু উদ্দিন ও ১৭ জুলাই ক্যাপ্টেন শাহারিয়া সাব-সেক্টরের দায়িত্ব নেন। তবে এ জেলায় জনসাধারণের মধ্যে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন, সাবেক জেলা গভর্নর প্রয়াত ফজলুল করিম, সাবেক পৌর চেয়ারম্যান বর্তমানে বর্ষিয়ান আকবর হোসেন, পীরগঞ্জের সাবেক এমপি শহিদুল্লাহ শহীদ প্রমুখ।
২১ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হয় বালিয়াডাঙ্গী, পীরগঞ্জ, রানীশংকৈল ও হরিপুর থানা অঞ্চলে।
২৯ নভেম্বর এ মহকুমার পঞ্চগড় থানা প্রথম শত্রু মুক্ত হয়। এরপর পাকবাহিনীর মনোবল ভেঙে যায়। তারা প্রবেশ করে ঠাকুরগাঁওয়ে।
৩০ নভেম্বর পাকসেনারা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভুল্লী ব্রিজ উড়িয়ে দেয়। তারা সালন্দর এলাকায় সব জায়গায় বিশেষ করে ইক্ষু খামারে মাইন পুতে রাখে। মিত্রবাহিনী ভুল্লী ব্রিজ সংস্কার করে ট্যাংক পারাপারের ব্যবস্থা করে।
পহেলা ডিসেম্বর কমান্ডার মাহাবুব আলমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ঠাকুরগাঁওয়ে ঢুকে। ২ ডিসেম্বর রাতে ঠাকুরগাঁওয়ে প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়। ওই রাতেই শত্রু বাহিনী ঠাকুরগাঁও থেকে পিছু হঁটে ২৫ মাইলে অবস্থান নেয়। পরে ৩ ডিসেম্বর বিজয়ের বেশে ঠাকুরগাঁওয়ে ঢুকে মুক্তিযোদ্ধারা। এসময় স্বদেশের পতাকা উড়িয়ে ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে আনন্দ উল্লাস করে এলাকার মুক্তিকামী মানুষ।
এ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বদরুদ্দোজা বদর বলেন, যুদ্ধে পাকসেনারা পিছু হটতে শুরু করে। ঠাকুরগাঁওয়ের অদূরে ভূল্লি ব্রিজ আমরা বোমা মেরে উড়িয়ে দিলে পাকসেনারা সৈয়দপুরে পালিয়ে যায় । আমরা বীরের বেশে প্রবেশ করি ঠাকুরগাঁও শহরে।
এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বর্ষিয়ান জননেতা আকবর হোসেন বলেন, আমাদের মুক্তির যুদ্ধ শেষ হয়নি, এখনো লড়াইয়ে আছি।
জেলা মুক্তিযোদ্ধার সাবেক কমান্ডার বদরুদ্দিন বদর বলেন, ‘জেলায় এখনও অনেক মুক্তিযোদ্ধার সমাধি চিহ্নিত হয়নি, মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্বপ্নই এখনো অবাস্তবায়িত, তাই মানুষের সার্বিক মুক্তিই সত্যিকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ’
বার্তাবাজার/এম.এ.আর