রাজধানীর সাথে দক্ষিণবঙ্গের সংযোগস্থল পোস্তগোলা ও কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদের মধ্যে ১৯৮৮ সালে তৈরি হয় বুড়িগঙ্গা চীন- মৈত্রী সেতু। সেতুটি চালু হওয়ার পর কেটে গেছে ৩২ বছর। এত বছর পরেও সেতুটি টোলমুক্ত না হওয়ায় রয়েছে নানা প্রশ্ন।
টোল আদায়কারী ইজারাদার ও স্থানীয় সওজের কর্মকর্তারা সিন্ডিকেট গড়ে বছরের পর বছর নাটকীয় পন্থায় টোল আদায় করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলেও রয়েছে অভিযোগ।
আর অতিরিক্ত টোল আদায় করা নিয়ে গাড়ি চালকদের সাথে পুলিশ, সওজ কর্তৃপক্ষ ও ইজারাদার সিন্ডিকেটের আন্দোলনও হয়েছে একাধিকবার। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর ইজারাদার, সওজ কর্মকর্তা ও পুলিশের সম্মিলিত সিন্ডিকেটের সাথে গাড়ি চালকদের আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে প্রান হারায় সোহেল নামে এক ট্রাক হেলপার। তারপরেও চলছে অতিরিক্ত টোল আদায়ের মহোৎসব। এখন আদায় করা হচ্ছে ৩০ টাকা পরিবর্তে ৭৫০ টাকা। আচমকা ২৫ গুণ বৃদ্ধি করে একরকম জোড়পূর্বক আদায় করা হচ্ছে এই টোল। এতে চরম বিপাকে পড়েছে পরিবহন মালিকরা। তবে পুলিশের জন্য সেতুটি টোলমুক্ত রেখেছে ইজারাদার কে.আলম শিপিং লাইন।
জানা গেছে, বুড়িগঙ্গার প্রথম সেতুটি টোলমুক্ত করার দাবিতে বেশ কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করে আসছে পরিবহন শ্রমিকরা। এরই মধ্যে ২০১৫ সালে নতুন টোলনীতি অনুসারে পোস্তগোলা সেতুর টোল আদায়ের হার পূর্বে তুলনায় ২৫গুণ বৃদ্ধি করা হয়। ২০ অক্টোবর-২০১৮ থেকে নতুন ইজারাদার ৩০ টাকা পরিবর্তে ৭৫০ হারে টোল আদায় শুরু করলে পরিবহন শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে পুনরায় আন্দোলনে শুরু করে। ২৬অক্টোবর- ২০১৮ আন্দোলনের এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ বাঁধে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শ্রমিকের প্রাণ হারানো সহ গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয় আরো ৬ জন । এ ঘটনার পর সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্দেশে টোল আদায় বন্ধ রাখে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান কে.আলম শিপিং লাইন।

কিন্তু প্রায় ৯ মাস বন্ধ থাকার পর ১ জুলাই-২০১৯ থেকে পুনরায় বর্ধিত হারেই টোল আদায় শুরু করে উক্ত ইজারাদার। তবে কৌশলে পুলিশের জন্য সেতুটি চিরস্থায়ী টোলমুক্ত রাখা পাশাপাশি সিএনজির টোল আদায়ও সাময়িক বন্ধ রাখেন। পুলিশের গাড়ী বাদে সিএনজিসহ ছোট বড় সব ধরনের গাড়ী থেকেই এখন টোল আদায় করা হচ্ছে তাদের ইচ্ছে মাফিক নিয়মে। প্রদর্শিত তালিকায় মোটরসাইকেলের জন্য ২৫ টাকা উল্লেখ থাকলেও সাংবাদিকের মোটরসাইকেল থেকে কিছুদিন ১০ টাকা হারে টোল আদায় করে এখন তা বৃদ্ধি করা হয়েছে ১৫ টাকায়।
ইজারাদারের দাবী অনুযায়ী টোল আদায় করা বৈধ হলেও গ্রাহককে দেয়া হচ্ছে না আদায়কৃত টাকার পরিবর্তে কোন রশিদ বা ভাউচার। তবে কেউ রশিদ চাইলে বহু তর্কবিকর্তের পর দেয়া হয় নানা অসঙ্গতিপূর্ন রশিদ।
এদিকে ইজারাদার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৫ সালে পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী টোল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নতুন টোল অনুযায়ী ট্রেইলার ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা, হেভি ট্রাক ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪০ টাকা, মাঝারি ট্রাক ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২৫ টাকা, মিনি ট্রাক ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা, মিনিবাস/ কোস্টার ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা, মাইক্রোবাস ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা, প্রাইভেট কার ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা, থ্রি-হুইলার যানবাহন আগে টোল
ফ্রি থাকলেও নতুন টোল ধার্য করা হয়েছে ২৫ টাকা। একইভাবে টোলমুক্ত থাকা মোটরসাইকেল ও রিক্সা, ভ্যান, সাইকেল, ঠেলাগাড়ির টোল ধরা হয় যথাক্রমে ১৫ ও ১০ টাকা।

কিন্তু ওই সময়ে শ্রমিক আন্দোলনের ফলে বর্ধিত হারে টোল আদায় না করে পূর্বের হারে ইজারাবিহীন টোল আদায় অব্যাহত রাখে সড়ক ও জনপদ বিভাগ, যা অব্যাহত ছিল ২০১৮ সালে অক্টোবর পর্যন্ত। ওই বছরের ২০ অক্টোবর-২০১৮ থেকে নতুন ইজারাদার ‘কে
আলম শিপিং লাইন’ বর্ধিত হারে টোল আদায় শুরু করে। ফলে আবারো শ্রমিক আন্দোলনের কারণে সোহেল নামে ট্রাক হেলপার পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ায় আবারো দীর্ঘ ৯ মাসের মতো টোল আদায় বন্ধ রাখা হয়। সিএনজি অটোরিক্সার মালিক শফিক বলেন, তাদের সিএনজিগুলো শুধু সেতু পারাপারেই চলাচল করে। এক্ষেত্রে তারা যাত্রী প্রতি ভাড়া নেন ১০
টাকা। ৫ যাত্রী নিলে পাওয়া যায় ৫০ টাকা। বর্ধিত টোলের হার অনুযায়ী প্রতিবারে ২৫ টাকা টোল দিলে তাদের হাতে থাকে ২৫ টাকা। এতে তাদের খরচও উঠে আসে না। তাই তাদের দাবি সেতুটি পূর্বের মতো টোলমুক্ত করা হোক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টোল সংশ্লিষ্ট একটি সুত্র জানায়, সরকারের নির্মিত নতুন সেতুগুলোর দৈর্ঘ্য অনুসারে ২০১৫ সালে পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী টোল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। টোলের হার হ্রাস-বৃদ্ধি করা হয়। আর এই সুযোগটিকেই কাজে লাগায় বুড়িগঙ্গা সেতুর টোল আদায় সিন্ডিকেট। সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চোখ ফাকি দিয়ে মনগড়া টোলের হার নির্ধারণ করে সন্ত্রাসী কায়দায় প্রতিদিন আদায় করা হচ্ছে টোল।
সওজের কেরানীগঞ্জ সড়ক উপ-বিভাগ হাসনাবাদ এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ বেল্লাল হোসেন বলেন, সরকারের নির্ধারিত নিয়ম মেনেই টোল আদায় করা হচ্ছে।
বার্তাবাজার/এসজে